‘ডায়মন্ড-কাটার’ দিয়ে কেটে ফেলা হচ্ছে হাসনাবাদ সেতুর পিলার। কাটতে খরচ পড়ছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। কেকের মতো করে দু’টি পিলার খণ্ড খণ্ড করে কাটার পরে কাঠাখালি নদীর মাঝে গড়ে উঠবে নতুন তিনটি পিলার। তার উপরে তৈরি হবে সেতু। দু’পারের রাস্তা-সহ সেতু তৈরিতে খরচ হবে প্রায় ৯১ কোটি টাকা। 

ইতিমধ্যে একটি পিলারের প্রায় অর্ধেক কাটা হয়ে গিয়েছে। এক পাড়ের রাস্তার কাজও বেশ খানিকটা এগিয়েছে। সেতুর কাজ কতটা এগোল, তা দেখতে আজ, রবিবার হাসনাবাদে আসছেন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। তৃণমূলের একটি সূত্র জানাচ্ছে, নভেম্বর মাসে সেতুর কাজ দেখতে আসবেন মুখ্যমন্ত্রী।

জ্যোতিপ্রিয়বাবু বলেন, ‘‘হাসনাবাদ সেতু তৈরি আমাদের অনেক দিনের লড়াইয়ের ফসল। ঠিকাদার আড়াই বছরের মধ্যে সেতুর কাজ শেষ করবে বললেও আমরা চাই ১ বছর ৯ মাসের মধ্যে শেষ হোক হাসনাবাদ সেতু। সে দিকে লক্ষ্য রেখে কাজ চলছে।’’ খাদ্যমন্ত্রীর দাবি, বাম আমলে করা সেতুর দু’টি পিলার অকেজো হওয়ায় তা ভেঙে ফেলে সেখানে নতুন করে পিলার করতে হচ্ছে। তা না হলে আরও আগেই শেষ হতো হাসনাবাদ সেতু।   

কিন্তু এত সবের পরেও সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের মনে ভরসা নেই। এই সেতু তৈরি নিয়ে এত টালবাহানা দেখেছেন তাঁরা, কারও কথায় আর বিশ্বাস রাখতে পারছেন না। অনেকেরই বক্তব্য, ‘‘হাসনাবাদে কাঠাখালি সেতু শেষ হবে তো?’’ এমন সংশয়ের অবশ্য যথেষ্ট কারণও আছে।

গত ২০০৬ সালে রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আবাসনমন্ত্রী গৌতম দেব এবং পূর্তমন্ত্রী ক্ষিতি গোস্বামীকে পাশে নিয়ে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে কাঠাখালি নদীর উপরে সেতুর শিলান্যাস করেছিলেন। কথা ছিল, তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ হবে। কিন্তু ছ’বছর পরে জানা যায়, জলের মধ্যে তৈরি দু’টি পিলার সম্পূর্ণ অকেজো। পিলারের মাঝে মাঝে ফাঁকা থাকার জন্য ওই পিলারের উপরে সেতু তৈরি সম্ভবই নয়।

এরপরে নানা টালবাহানায় কেটে যায় আরও কয়েকটা বছর। রাজ্যে সরকার বদল হয়ে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল। দু’টি পিলারকে ঘিরে মুম্বই, যাদবপুর এবং খড়গপুর-সহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে বিশেষজ্ঞ দলের আসা-যাওয়া শুরু হয়। নানান যন্ত্রের সাহায্যে পিলার পরীক্ষার পরে বিশেষজ্ঞেরা জানান, পিলার দু’টি ভেঙে নতুন করে করতে হবে। তবেই তার উপরে সেতুর নির্মাণ সম্ভব। 

২০১২ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে তৎকালীন পূর্ত ও সড়ক দফতরের মন্ত্রী সুদর্শন ঘোষদস্তিদার হাসনাবাদে এসে বলেছিলেন, দু’এক বছরের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করে সেতুর উদ্বোধন করা হবে। এরপরে কেটে যাওয়ার উপক্রম আরও তিনটি বছর। সামনেই ২০১৬ সালে রাজ্যে বিধানসভা ভোট। সে দিকে লক্ষ্য রেখেই কি সেতুর কাজ শেষ করার উপরে জোর দিচ্ছে রাজ্য, উঠছে সেই প্রশ্নও। কিন্তু মাঝপথে আবার কোনও বাধা আসবে না তোল এই সংশয়ও ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষের মনে। 

সেতু নির্মাণ সংস্থার এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘আড়াই বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা বললেও আরও আগেই কাজ শেষ করার জন্য আমাদের উপরে উপরতলার চাপ রয়েছে।’’ তিনি জানান, রাজস্থানের একটি সংস্থা পুরনো পিলার দু’টি ‘ডায়মন্ড-কাটার’ (হীরে বসানো কাটার যন্ত্র) দিয়ে কেটে ফেলছে। একটি পিলারের অর্থেক কাটা হয়েও গিয়েছে। একই সঙ্গে নদীর দু’পাশে দু’শো করে মোট চারশো মিটার রাস্তার কাজেও গতি আনা হয়েছে। কালীপুজোর পরে নদীর মধ্যে নতুন তিনটি পিলার তৈরির কাজ শুরু হয়ে যাবে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী মার্চের মধ্যে পিলারগুলির ঢালাইয়ের কাজ অনেকটাই হয়ে যাবে। ওই পিলারের উপর প্রায় ২১০ মিটার সেতু জোড়ার কাজ শেষ করতে বেশি সময় লাগবে না।

এই সেতুর কাজ শেষ হলে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামে কয়েক হাজার মানুষ গাড়িতে সরাসরি কলকাতা পৌঁছতে পারবেন। একই ভাবে কলকাতা থেকে একই গাড়িতে বসে পর্যটকেরা সুন্দরবনের কাছাকাছি যেতে পারবেন। পর্যটক এলে লাভবান হবেন সুন্দরবনের এই প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ। যত দিন না সেতুর কাজ শেষ হয়, দুলদুলি এবং লেবুখালির মধ্যে সাহেবখালি নদীর উপরে বড় ভেসেল চালুর চেষ্টা করছে রাজ্য।