বাগদা ব্লকের সব্জির সুনাম অনেক দিন আগেই রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে ভিন রাজ্যে। বাগদার সব্জি এখন পাড়ি দেয় দিল্লি, বিহার, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, ছত্রিশগড়ের মতো অনেক রাজ্যেই। বেগুন, পটল, পেঁপে, কলা, সবই যাচ্ছে রাজ্যের সীমানা পার করে।

বাগদা বাজার এলাকায় প্রতি সপ্তাহের মঙ্গল এবং শনিবার হাট বসে। ভোর রাত থেকেই গোটা ব্লকের চাষিরা গাড়ি বোঝাই করে কাঁচা মাল হাটে নিয়ে আসতে শুরু করেন। সকাল ৬টা থেকে শুরু হয়ে যায় পাইকারি হাট। চলে দুপুর তিনটে পর্যন্ত। তারপর শুরু হয় খুচরো বিক্রির হাট। বাগদা সব্জি হাট বিখ্যাত। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ব্লকে মোট ২৩টি হাট এবং ২৭টি দৈনিক বাজারের মধ্যে বাগদা হাটটিই সব থেকে বড়।  গোটা জেলার মধ্যেও বাগদার হাটটি অন্যতম বড় হাট।   চাষিরা জানালেন, বাগদা হাটে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লক্ষ টাকার বেচা কেনা হয়ে থাকে। পাঁচ হাজারেরও বেশি চাষি এখানে আসেন। সব্জির হাটের সঙ্গে একই ছাতার তলায় রয়েছে কলা, কাঁঠাল, ধান, গুড়ের আলাদা আলাদা হাট।

 হাটটির রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। এলাকার প্রবীণ চাষিরা জানালেন, বর্তমান জায়গায় হাটটি বসছে ১৯৭৬ সাল থেকে। তারও আগে অতীতে বাগদার হাট বসত সন্ধ্যায়। একটি বটগাছের তলায় চলত হাট। লম্ফ জ্বালিয়ে বা হ্যারিকেনের আলোয়  চলত বেচাকেনা। চাষিরা মাথায় বস্তা করে বা গরুর গাড়ি করে সব্জি নিয়ে আসতেন।  তখন বনগাঁ-বাগদা সড়ক ছিল আরও সরু। চারিদিক বন জঙ্গলে ভরা ছিল। রাস্তায় বা এলাকায় কোনও বিদ্যুতের ব্যবস্থা ছিল না। মানুষের যাতায়াতের ব্যবস্থা বলতে ছিল হ্যাণ্ডেল দিয়ে স্টার্ট করা বাস।

বনগাঁ থেকে বাগদার দূরত্ব ২৪ কিলোমিটার। ওই পথে সেই সময় বাস ভাড়া ছিল ৪৫ পয়সা। এখন ভাড়া ১৭ টাকা। চাষিরা সব্জি হাটে নিয়ে আসতেন, যদি তা বিক্রি না হত তবে বেতনা নদীতে ফেলে দিয়ে যেতেন। এখন অবশ্য সেই বাগদা নেই। পাল্টে গিয়েছে, দোকানপাট বাজার হাসপাতাল, বিডিও অফিস, স্কুল, ব্যাঙ্ক, এটিএম, কী নেই এখন।

কিন্তু পরিকাঠামো আজও যেভাবে তৈরি না হওয়ায় চাষিরা মালপত্র নিয়ে এসে খুবই অসুবিধার মধ্যে পড়েন। বনগাঁ-বাগদা সড়কের পাশে প্রায় দু’বিঘে জায়গা জুড়ে বসে হাট। কিন্তু বাস্তবে ওই হাট ছাড়িয়ে পড়ে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা নিয়ে। সড়কও অনেক ক্ষেত্রে অবরুদ্ধ হয়ে যায়। যানবাহন ব্যবস্থা উন্নত হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে রাতে যাতায়াত সমস্যা আজও মেটেনি। বাগদা বাজার থেকে অটো সরাসরি বনগাঁ যায়না। রাতে ৮টা কুড়ির পর আর কোনও বাস বনগাঁয় আসেনা। রাতে ভাড়া গাড়িই ভরসা।

তৃণমূলের বাগদা ব্লক কৃষক ও খেত মজুর কমিটির কার্যকারী সভাপতি দীনবন্ধু হীরা বলেন,‘‘এখানকার চাষিদের বাইরে সব্জি নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সব থেকে বড় অসুবিধা পরিবহণ।’’ তিনি জানান, প্রয়োজন আরও ব্যাঙ্কের। একটিই ব্যাঙ্ক আছে। চাষিদের সেখানে টাকা তুলতে গেলে প্রায় তিন চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। প্রচুর ভিড় হয়। দিনটাই নষ্ট হয়ে যায়।   হাটটি এখন স্থানীয় বাগদা গ্রাম পঞ্চায়েতের নিয়ন্ত্রণে। পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে হাট চত্বরে ইট ফেলা হয়েছে। তবে চাষিরা জানালেন, হাটের জল নিকাশির অবস্থা খুবই খারাপ। নেই শৌচাগার এবং পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা। হাট কমিটির সভাপতি রতিরঞ্জন চৌধুরী জানালেন, ‘‘গোটা হাট চত্ত্বরটি কংক্রিটের করতে হবে। তা না হলে বর্ষায় কাদায় ভরে যায়। অভাব রয়েছে পানীয় জলের ক‌লের এবং হ্যালোজেন আলোর।’’স্থানীয় বিধায়ক তথা রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দফতরের মন্ত্রী উপেন বিশ্বাস হাটে একটি পাকা ছাউনি করে দিয়েছেন। বৃষ্টির সময় চাষিরা সেখানে গিয়ে মাথা গোঁজেন।    কিন্তু সব্জি সংরক্ষণের কোনও ব্যবস্থা আজও গড়ে তোলা হয়নি সরকারের পক্ষ থেকে। রবিন মণ্ডল নামে ৬২ বছরের এক চাষি কথায়, ‘‘একবার খেত থেকে সব্জি তুলে ফেললে, ফড়েরা যে দাম দেবে তাতেই চাষিরা  বিক্রি করতে বাধ্য হন।  জলের দরেও সব্জি বিক্রি করে দেন। কারণ সব্জি সংরক্ষণের কোনও ব্যবস্থা এখানে  নেই। দীর্ঘদিন ধরেই আমরা দাবি জানিয়ে আসছি সরকারি ভাবে এখানে সব্জির হিমঘর তৈরির। কিন্তু তা তৈরি হয়নি।’’

  সমস্যা রয়েছে আরও। ট্রাকে করে মালপত্র নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতে হলে খরচ যা পড়ে যায় তাতে লাভ আর বিশেষ থাকে না। তাই এলাকার চাষিদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, বাগদা দিয়ে রেল যোগাযোগ গড়ে উঠুক। তাহলে চাষিরা সহজেই কম খরচে সব্জি অন্যত্র নিয়ে যেতে পারবেন। কয়েক বছর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী থাকাকালীন রেল বাজেটে বনগাঁ থেকে বাগদা পর্যন্ত রেললাইন তৈরির কথা ঘোষণা করেছিলেন। সমীক্ষার কাজও শুরু হয়েছিল। আশায় বুক বাঁধতে শুরু করেছিলেন এখানকার চাষিরা।