বহু ইতিহাসের সাক্ষ্যবহন করে চলেছে ক্যানিং। কিন্তু গৌরবময় ইতিহাস থাকলেও বর্তমান শহরের নানা অভাব-অভিযোগ থেকেই গিয়েছে। ঐতিহাসিক জায়গাগুলির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও অবহেলা আছে। শিল্পের নানা পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও শিল্প না হওয়ায় মানুষের ক্ষোভ আছে।

ক্যানিং থানার মাতলা নদীর ধারে ডাবু গ্রামটি সুপরিচিত। পিকনিকের আদর্শ জায়গা। এটিও নানা ইতিহাসের সাক্ষী। এখানেই লর্ড ক্যানিংয়ের কাছারি বাড়ি ছিল, যা এখন নদীগর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রোডে পোর্ট ক্যানিংয়ের দু’টি কার্যালয় ছিল। যার মধ্যে একটি বাম আমলে ভেঙে ফেলা হয়। হাইস্কুলপাড়ায় পোর্ট ক্যানিংয়ের কার্যালয় অবশ্য এখনও আছে। যা ব্রিটিশ আমলের ক্যানিংয়ের বহু স্মৃতি বহন করে। কিন্তু সুন্দরবনের প্রবেশপথ ক্যানিংয়ে কোনও সংগ্রহশালা নেই। ক্যানিংয়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি, পোর্ট ক্যানিংয়ের বাড়িটি অধিগ্রহণ করে সংগ্রহশালা করা হোক।

মাতলা-বিদ্যাধরী নদীর মোহনায় প্রতাপাদিত্যের একটি দুর্গ ছিল। যার অধ্যক্ষ ছিলেন সেনানায়ক হায়দার মানক্লি। সে কারণেই দুর্গটির নাম ছিল ‘হায়দারগড়’। হায়দারের নামের সঙ্গে জড়িত বুরুজ খানা, হায়দার আবাদ প্রভৃতি এখনও প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।

পুরনো হলেও ক্যানিং খুব পরিকল্পনা মাফিক গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অভাবই যার কারণ। এখানে কিছু স্কুল আছে, যেগুলিও বয়সে বেশ প্রাচীন। যেমন, রাজকৃষ্ণ প্রাইমারি স্কুল, ডেভিড সেশুন হাইস্কুল, রায়বাঘিনি বিদ্যালয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্কুলগুলির পরিকাঠামো অবশ্য বিশেষ বাড়েনি। নতুন নতুন স্কুল তৈরির চাহিদা আছে। মালতার চরে একটি কেন্দ্রীয় স্কুল চালু হওয়ার অপেক্ষায়। ক্যানিংয়ের রাজকৃষ্ণ কলোনিতে একটি প্রাচীন শিবমন্দির আছে। স্টেশনের পাশে একটি বনবিবির মন্দির হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির চিহ্ন ধরে রেখেছে। কিন্তু যত্নের অভাবে সেটিও ভগ্নপ্রায়। রেল যদি মন্দিরটি অধিগ্রহণ করে, তবে সেটি পর্যটকদের কাছে দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন স্থানীয় মানুষ।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালের আরও নানা নির্দশন ছড়িয়ে আছে অধুনা জঙ্গলের ভিতরে। সে সব সংরক্ষণ বা গবেষণার কোনও ব্যবস্থাই হয়নি। ভারতবর্ষের তৃতীয় শহর হিসাবে ১৮৬২-৬৩ সালে ক্যানিংয়ে রেলপথ চালু হয়। যাত্রিসংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। কিন্তু ক্যানিং স্টেশনে চারটি টিকিট কাউন্টার থাকা সত্ত্বেও একটি বহু দিন ধরেই বন্ধ পড়ে আছে। সুন্দরবনে বেড়াতে আসার ক্ষেত্রে বহু পর্যটক এই রেলপথ ব্যবহার করেন। কিন্তু ক্যানিংয়ে রেলের জমি দখল করে একটি পল্লি গড়ে উঠেছে। এই জমিকে বাণিজ্যিক ভাবে ব্যবহার করলে রেলের লাভ হতে পারত। ক্যানিং স্টেশনে হকারদের দৌরাত্ম্য নিয়েও অভিযোগ আছে নিত্যযাত্রীদের। পকেটমারের উপদ্রবও ঘটে হামেশাই। শৌচাগারের অবস্থাও ব্যবহারের অযোগ্য বলে অভিযোগ স্থানীয় মানুষের। স্টেশন থেকে বেরিয়ে যানজটে পড়তে হয় মানুষকে। স্টেশন থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে অর্থাত্‌ বাস রাস্তায় যদি একটি উড়ালপুল তৈরি করা যায়, তা হলে শহরবাসী উপকৃত হবেন। রাস্তার দু’ধার হকারমুক্ত করাও দরকার। বাম সরকারের আমলে স্পোর্টস কমপ্লেক্সে বাজার তৈরি করে হকারদের পুনর্বাসন দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে সব খালিই পড়ে আছে।

কর্মসংস্থানের অভাব খুবই বেশি ক্যানিংয়ে। মূলত মাছ ও ফসল চাষই এখানকার মানুষের পেশা। বেশির ভাগ মানুষই বেশ দরিদ্র। বাম আমলে মাতলার চরে বিশ্বব্যাঙ্কের টাকায় ফিসারি করা হয়েছিল। কিছু বেসরকারি সংস্থাও মাছ চাষ শুরু করেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে সে সব থেকে বিশেষ উপকৃত হননি সাধারণ মানুষ। ফিসারিগুলি যদি ফের সরকারি উদ্যোগে চালু করা যায়, তবে অনেকে উপকৃত হবেন। বহুমুখী হিমঘর চালু হলে বহু চাষির সুবিধা হবে। না হলে উত্‌পাদিত ফসল, মাছ কম দামে এলাকাতেই বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন ছোট চাষিরা। ক্যানিংয়ের নিকারিঘাটায় এক সময়ে সূর্যমুখী লঙ্কার চাষ হত। কলকাতার বাজারে যার নামডাক ছিল। কিন্তু একবার বন্যায় জমিতে নোনা জল ঢুকে সেই চাষ প্রায় বন্ধের মুখে। 

ক্যানিং ১, ক্যানিং ২, বাসন্তী ও গোসাবা এই চারটি ব্লক নিয়ে ১৯৯৬ সালের ৩ মার্চ গঠিত হয় ক্যানিং মহকুমা। এ রাজ্যের ইতিহাসে ক্যানিংই ছিল প্রথম পুরশহর। পরে সেই তকমা মুছে যায়। স্বাধীনতার পরে মহকুমা শহর হিসাবে গড়ে উঠলেও পুরসভার তকমা এখনও ফিরে পায়নি এই শহর। বার তিনেক ঘোষণা হওয়ার পরেও কাজ এগোয়নি। কিন্তু স্থানীয় মানুষজনের মতে, পঞ্চায়েত এলাকা হিসাবে যে খাজনা আদায় হয়, তা দিয়ে এমন ঐতিহাসিক শহরের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সে জন্যই পুরসভা হওয়া আরও বেশি দরকার। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জেলাপরিষদ এবং সুন্দরবন উন্নয়ন পর্ষদের টাকায় কংক্রিটের রাস্তা এবং মাতলার চরে সরকারি ভবন তৈরির কাজ চলছে। স্পোর্টস কমপ্লেক্সের কাজও হচ্ছে।

কিন্তু ক্যানিংয়ে তেমন কোনও শিল্পই গড়ে ওঠেনি। ভারি শিল্প না হলেও যদি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পও হত, অনেকের কর্মসংস্থান সম্ভব ছিল।