কলেজের অতিরিক্ত ভবন নির্মাণের জন্য সরকারি ভাবে কয়েক বছর আগে টাকা অনুমোদন করা হয়েছিল। কিন্তু ভবন তৈরি না হওয়ায় ফেরত গেল সেই টাকা। ঘটনাটি সুন্দরবনের বাসন্তী ব্লকের সুকান্ত কলেজের।

ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী জানান, ভবনটি তৈরি না হওয়ায় সমস্যায় পড়বেন প্রত্যন্ত সুন্দরবন তথা বাসন্তী ব্লক এলাকার ছাত্রছাত্রীরা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, কলেজের রাশ কার হাতে থাকবে এবং পরিচালন সমিতিতে কারা থাকবেন— সেই নিয়ে তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এই কারণেই নতুন ভবন তৈরির ক্ষেত্রে সঙ্কট তৈরি হয়। ফেরত চলে যায় টাকা।

স্বাধীনতার পর থেকেই বাসন্তী ব্লক এলাকায় একটি কলেজ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন এলাকাবাসী। অবশেষে ২০০৭ সালে বাম সরকারের আমলে বাসন্তী ব্লক এলাকায় একটি কলেজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। সেই সময়ে কোথায় কলেজটি তৈরি হবে, তা নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সুন্দরবন উন্নয়ন পর্ষদের প্রাক্তন সদস্য লোকমান মোল্লা স্থানীয় নেতৃত্বকে সঙ্গে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটি ঠিক করে, বাসন্তীর ভাঙনখালিতে কলেজটি তৈরি হবে। সেই মতো রাজ্যের উচ্চশিক্ষা সংসদ অনুমোদনও দেয়। প্রথম দিকে, কলেজের নিজস্ব ভবন না থাকায় ২০০৮ সালে কুলতলি মিলনতীর্থ সোসাইটির ট্রেনিং হলে কলেজের পঠন-পাঠন শুরু হয়েছিল। কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি লোকমান মোল্লার চেষ্টায় উচ্চশিক্ষা দফতর, সুন্দরবন উন্নয়ন পর্ষদ ও এলাকার সাংসদ ও বিধায়কের তহবিল থেকে টাকা সংগ্রহ করে ভাঙনখালিতে ১৫ হাজার বর্গ ফুটের একটি একতলা ভবন নির্মিত হয়। শুরু হয়ে যায় পঠন-পাঠনও। কিন্তু স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় অনেক ছাত্রছাত্রীই কলেজে ভর্তি হতে পারছিলেন না।

অতিরিক্ত একটি ভবন নির্মাণের কথা জানিয়ে লোকমান আবারও উচ্চশিক্ষা দফতরে আবেদন করেন। সেই মতো উচ্চশিক্ষা দফতর ২ কোটি ৭৬ লক্ষ ৪৮ হাজার টাকা অনুমোদন করে। ২০১১ সালে সরকারের পালাবদল হয়। অভিযোগ, তারপর থেকেই কলেজের রাশ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে শাসকদলের মধ্যে চাপানউতোর তৈরি হয়। এর মধ্যে কলেজের ‘অর্গানাইজিং কমিটি’ মহকুমাশাসকের দ্বারস্থ হয়ে তাঁকে অনুরোধ জানায়, পূর্ত দফতর বা জেলা পরিষদ বা এই জাতীয় সরকারি কোনও দফতরকে দিয়ে নতুন ভবনটি নির্মাণ করা হোক। এ দিকে, শাসকদলের চাপে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম পদত্যাগ করেন বলে অভিযোগ। পরবর্তী সময়ে প্রদীপকুমার দে কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। এ দিকে, কলেজে ছাত্র সংসদ না থাকা সত্ত্বেও প্রতিনিয়ত শাসকদলের ছাত্র সংগঠন লোকমান মোল্লার পদত্যাগ চেয়ে বিক্ষোভ দেখাতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে লোকমান কলেজের সভাপতি পদ ছেড়ে দেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পরিচালন সমিতি গঠন করে দেয়। সভাপতি হন যদুপতি দাস। তিনিও তিন মাসের মধ্যে পদত্যাগ করেন। এর পরে গোসাবার বিধায়ক জয়ন্ত নস্করের অনুগামী ভোলানাথ পান্ডে কলেজ পরিচালন সমিতির সভাপতি হন। কিন্তু তিনিও কয়েক মাস পরে পদত্যাগ করেন। এর মধ্যে আবার কলেজের অধ্যক্ষ প্রদীপকুমার পদত্যাগ করে কলেজ ছেড়ে চলে যান। তাঁর জায়গায় অমিত বসাক অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন। তিনিও নানা কারণে পদত্যাগ করেন। এর পরে রাজ্য সরকার ক্যানিংয়ের মহকুমাশাসককে কলেজের প্রশাসক নিয়োগ করে। কলেজের বর্ষীয়ান শিক্ষক অরুণাভ রায় টিচার-ইন-চার্জ (টিআইসি) হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। 

অভিযোগ, প্রতিনিয়ত বিক্ষোভের কারণে বহু ছাত্রছাত্রী সুকান্ত কলেজ ছেড়ে ক্যানিংয়ের বঙ্কিম সর্দার এবং গোসাবার পাঠানখালি হাজি দেশারত কলেজে ভর্তি হতে চলে যান। স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের অভিযোগ, কলেজের অতিরিক্ত ভবন নির্মাণের ওই টাকাটাই হল গোলযোগের মূল কারণ। সেই টাকা দীর্ঘ দিন ব্যাঙ্কে পড়ে থাকায় সুদ-সহ বেড়ে তা হয় ৩ কোটি ৫৩ লক্ষ ৬৪ হাজার ৫১১ টাকা। ভবন তৈরি না হওয়ায় এই পুরো টাকাটাই ফেরত যায় বলে কলেজ সূত্রের খবর।

এ বিষয়ে কলেজের টিআইসি অরুণাভ রায় বলেন, ‘‘কলেজের অতিরিক্ত ভবন নির্মাণের টাকাটা বহু দিন ধরে পড়েছিল। আমার পূর্বতন কর্তৃপক্ষ নানা কারণে টাকাটা খরচ করতে পারেননি। আমরা টাকাটা খরচ করার চেষ্টা করেছিলাম। জেলা পরিষদকে লিখিত ভাবে জানিয়েছিলাম।’’ তিনি আরও জানান, জেলা পরিষদ থেকে কলেজের পাঁচিল তৈরির জন্য তাঁদের ‘এস্টিমেট’ দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়। তাঁরা আবারও তাদের চিঠি দেন। এর পরে টাকাটা ফেরত দেওয়ার জন্য চিঠি আসে।’’

ক্যানিংয়ের মহকুমাশাসক বন্দনা পোখরিয়াল বলেন, ‘‘আমি নতুন এসেছি। আমার আসার আগে কোনও একটা সমস্যায় কলেজে নতুন ভবন তৈরি করা যায়নি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী টাকাটা ফেরতও গিয়েছে।’’

কলেজের প্রাক্তন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি লোকমান বলেন, ‘‘আমি অনেক চেষ্টা করে কলেজের অতিরিক্ত ভবন নির্মাণের জন্য টাকাটা সরকারের থেকে আদায় করেছিলাম। অথচ সেই টাকায় অতিরিক্ত ভবন তৈরি হল না। টাকাটা ফেরত চলে গেল। এটা আমার কাছে অত্যন্ত কষ্টের। অতিরিক্ত ভবনটি তৈরি না হওয়ার ফলে ছাত্রছাত্রীদের সমস্যা হবে। অনেক ছেলেমেয়ে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।’’

এ বিষয়ে গোসাবার বিধায়ক জয়ন্ত নস্কর বলেন, ‘‘স্থানীয় কিছু দালাল সমস্যা তৈরি করায় কাজটা হল না। কিন্তু টাকাটা ফেরত গিয়েছে কিনা বলতে পারব না। খোঁজ নিয়ে জানতে হবে। টাকা ফেরত গিয়ে থাকলে তা অত্যন্ত দুঃখের।’’