বড় রাস্তা ছেড়ে গলি পথ ধরে খানিকটা গেলেই এক উঠোন আর টালির চালার দু’কামরার মাটির ঘর। দু’টি ঘরেই তালা ঝুলছে।

ঘরে কি কেউ নেই?

বার তিনেক ডাকার পরে পাশের বাড়ির একটা ঘরের জানলা খুলল। প্রশ্ন এল, কাকে চাই? 

বাড়িতে কেউ নেই? প্রশ্ন শুনে বেরিয়ে এলেন, মাঝবয়সী সায়রা বিবি। বাড়ির দাওয়ায় বসতে বসতে বললেন, ‘‘আমি একলা বাড়ি আগলে পড়ে রয়েছি।’’ বাকিরা কোথায়? সায়রা জানালেন, পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বাড়ির কর্তা, সিপিএম কর্মী জমশের আলি। পালিয়েছেন সায়রার দুই ছেলেও। 

গ্রামের নাম বইচগাছি। থানা আমডাঙা। অগস্ট মাসে পঞ্চায়েতের বোর্ড গঠনকে কেন্দ্র করে বোমা-গুলির লড়াইয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল আমডাঙার বইচগাছি, বড়গাছিয়া, টেঙাটেঙি, রতনপুর। বইচগাছি তারাবেরিয়া পঞ্চায়েতের মধ্যে। ১৫ আসনের এই পঞ্চায়েতে তৃণমূলের আসন ৫। বামেরা দখল করেছে ৮টি আসন। বাকি দু’টি বিজেপির। বাম-বিজেপি হাত মিলিয়েছে বলে দাবি দুই দলেরই। তারপর থেকেই গোলমাল। সেই গোলমালের পর থেকে ঘরছাড়া জমশেররা।

 তা হলে এখন সংসার চলছে কী করে? কেঁদে ফেললেন সায়রা। বললেন, ‘‘পার্টি থেকে চাল-ডাল আর আলু দেয়। তাতেই কোনও রকমে চালিয়ে নিচ্ছি।’’ বিঘে দুই জমি রয়েছে নিজেদের। যখন গোলমাল হয়, তখন জমিতে পাট ছিল। সায়রা জানান, সেই পাট আর ঘরে তুলতে পারেননি। 

এলাকার অন্যতম অর্থকরী ফসল পেঁয়াজ। ডিসেম্বরে পেঁয়াজ রোপণ করতে হয়। কিন্তু সে সময় পার হয়ে যাচ্ছে। সায়রা বললেন, ‘‘জমি খালিই পড়ে রয়েছে। হাতে একটা টাকাও নেই। জানি না, এ ভাবে কত দিন চলবে!’’ 

সায়রার মতো একই অবস্থা বইচগাছি, বড়গাছিয়ার বেশ কিছু পরিবারের। আব্দুল রব, ইসরাইল বল্লুক, সরিকুল শেখ, রকিবুল ইসলাম-সহ বেশ কিছু বাম সমর্থকদের বাড়িতে কেবল মহিলারাই রয়েছেন। আবার কিছু বাম সমর্থক সপরিবার গ্রামছাড়া। 

ফিরেওছেন কেউ কেউ। তাঁদেরই এক জন ইসরাইল বল্লুক। তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের খাতায় অভিযোগ না থাকলেও বাড়ি ছেড়েছিলেন গোলমালের পরে। বাড়ি ফিরেও অবশ্য নিশ্চিন্ত নন। ইসরাইলের কথায়, ‘‘যতক্ষণ না বোর্ড গঠনটা শেষ হচ্ছে, কখন কী হয়, বলা মুশকিল। ভয়ে ভয়ে থাকতে হয় সব সময়ে।’’ ছেলে এখনও ফিরতে পারেননি বলে জানালেন।

যাঁরা এখনও বাড়ির বাইরে, তাঁরা আছেন কোথায়?

সিপিএমের আমডাঙা এরিয়া কমিটির সম্পাদক সাহারাব মণ্ডল বলছেন, ‘‘এক একটি পরিবার এক এক জায়গায় থাকছে। সেটা আমরা গোপন রাখছি। তা-ও একই জায়গায় বেশি দিন থাকছে না কেউ। পুলিশের ভয়ে ঠাঁই বদল করতে হচ্ছে।’’ এলাকার বাইরে রয়েছেন এমন একটি পরিবার জানাল, খুব খারাপ অবস্থায় দিন কাটছে। জমি খালি পড়ে রয়েছে। বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারছে না। 

তাঁদের নামে কি কোনও অভিযোগ রয়েছে পুলিশের কাছে? কারও কারও দাবি, তেমন কোনও অভিযোগ নেই। নেহাত বাম সমর্থক বলেই ভয়ে গ্রামে পা রাখতে পারছেন না। 

বামেদের কত পরিবার এখন গ্রাম ছাড়া?

আমডাঙায় গোলমালের পরে গ্রেফতার হয়েছিলেন সিপিএমের উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য আমেদ খান। সম্প্রতি তিনি জামিন পেয়েছেন। গ্রামে ফিরতে পারেননি তিনিও। তাঁর দাবি, ‘‘এখনও শ’তিনেক মানুষ গ্রামছাড়া। তাঁদের ফিরতে দেওয়া হচ্ছে না।’’ এ নিয়ে প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

আমডাঙার বিধায়ক তৃণমূলের রফিকুর রহমানের অবশ্য দাবি, ‘‘সিপিএমের মাত্র পনেরো জন গ্রামছাড়া। বাকিরা সকলেই ফিরেছেন। স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। যাঁরা ফেরেননি, তাঁদের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ রয়েছে।’’

গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, অনেক বাম সমর্থক গ্রামে ফিরেছেন। মাঠে চাষও করছেন। মাসখানেক আগে খুলেছে গ্রামের স্কুল। কিন্তু গ্রামে ফিরলেও ভয় কাটছে না অনেকেরই। পুলিশ বলছে, গোলমালের ঘটনায় এখনও অন্তত ৫০ জন ফেরার। 

তা হলে এত বাম সমর্থক এখনও গ্রামছাড়া কেন? কীসের ভয়? 

                                    (চলবে)