বনগাঁ শহরের মতিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা অজিত সাহা। বয়স পঁচাত্তর। সাড়ে তিন বছর আগে তিনি কিডনির অসুখে আক্রান্ত হন। আড়াই বছর ধরে নিয়মিত ডায়ালিসিস চলছে। প্রথমে, সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালিসিস হত। এখন সপ্তাহে দু’দিন চলে। ফলে ওই দু’দিন তাঁকে যেতে হয় নদিয়ার রানাঘাটে। প্রত্যেক দিন গাড়ি ভাড়া ১২০০ টাকা। ডায়ালিসিস করাতে প্রতি দিন আরও ১২০০। সব মিলিয়ে এক দিনের ডায়ালিসিসে খরচ পড়ে যায় ২৪০০ টাকা! 

অজিতের মতো কিডনির অসুখে আক্রান্ত রোগীকে এত দিন ডায়ালিসিস করাতে ছুটতে হত রানাঘাট অথবা বারাসতে। বনগাঁয় ডায়ালিসিস সেন্টার ছিল না এত দিন।    

ওই সমস্যা এ বার দূর হল। বনগাঁ পুরসভা থেকে চালু করা হল  ডায়ালিসিস সেন্টার। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উদ্বোধন করেন প্রতিমন্ত্রী নির্মল মাজি। পুরসভার ‘স্বাস্থ্যদীপ’-এর অন্তর্গত এই ব্যবস্থা। মঙ্গলবার সেন্টারের দ্বারোদঘাটন হয়। অজিত বলেন, ‘‘এখন থেকে রানাঘাটে ছুটতে হবে না। বাড়ির কাছেই সুযোগ পাওয়া গেল। অনেকটা সুরাহা হবে।’’ 

পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, সেন্টার চালু করতে খরচ হয়েছে প্রায় ৭৫ লক্ষ টাকা। পুরপ্রধান শঙ্কর আঢ্য বলেন, ‘‘বনগাঁয় এত দিন কোনও ডায়ালিসিস সেন্টার না থাকায় স্থানীয় মানুষকে দুর্ভোগে পড়তে হত। গরিব মানুষের পক্ষে অনেক সময়ে তা সম্ভব ছিল না। ফলে একপ্রকার বিনা চিকিৎসায় মানুষ মারা যেতেন।’’ 

পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে,  ডায়ালিসিস সেন্টার তৈরি হয়েছে পুরসভার নিজস্ব তহবিলের টাকায়। ইতিমধ্যে বহু রোগী নাম লেখাতে শুরু করেছেন। পুরসভা সূত্রের খবর, প্রতি দিন ১৫ জন রোগীর এখানে ডায়ালিসিস হবে। শয্যা রয়েছে ৯টি। কলকাতা থেকে দু’দিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আসবেন। ডায়ালিসিস করাতে খরচ পড়বে দিনে এক হাজার টাকা। পুরপ্রধান জানিয়েছেন, দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাসকারী মানুষের জন্য আর্থিক ছাড় দেওয়া হবে। তাঁদের জন্য রোজ ৮০০ টাকা করে নেওয়া হবে। শয্যা সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে শীঘ্রই। শহরবাসী ছাড়াও মহকুমার প্রায় ১৩ লক্ষ মানুষ এর ফলে উপকৃত হলেন। বনগাঁর অনেকেই বারাসতে  ডায়ালিসিস করতে যান। এক ব্যক্তি সপ্তাহে তিন দিন বারাসতে ডায়ালিসিস করতে যান। রোজ তাঁর গাড়ি ভাড়া পড়ে ১৫০০ টাকা। সঙ্গে ডায়ালিসিসের জন্য ১৬০০ টাকা। তাঁর কথায়, ‘‘পুরপ্রধানের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। এত দিন টাকার অভাবে নিয়মিত ডায়ালিসিস করাতে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।’’     

বাংলাদেশ থেকে পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে বহু মানুষ এ দেশে রোজ চিকিৎসা করাতে আসেন। যাঁদের মধ্যে অনেকেই আসেন ডায়ালিসিস করাতে। কলকাতায় গিয়ে ডায়ালিসিস করাতে তাঁদের বিস্তর হ্যাপা পোহাতে হয়। বুধবার পেট্রাপোল সীমান্তে দেখা হল কয়েক জন বাংলাদেশির সঙ্গে। যাঁরা চিকিৎসার জন্য এ দেশে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে এক মহিলা কিডনির রোগে ভুগছেন। সীমান্ত-শহর বনগাঁয় ডায়ালিসিস সেন্টার চালু হয়েছে জানতে পেরে প্রশ্ন তুললে, ‘‘আমরাও কি ওখানে ডায়ালিসিস করানোর সুযোগ পাব। সেটা হলে আমরা খুবই উপকার হয়।’’ পুরপ্রধান বলেন, ‘‘কোনও বাংলাদেশি রোগী ডায়ালিসিস করাতে এলে আমরা তো আর তাঁকে ফেরাতে পারি না। ওঁরাও সুযোগ পাবেন।’’ 

বনগাঁ মহকুমা হাসপাতালটি এখন সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল। যদিও সেখানে ডায়ালিসিসের ব্যবস্থা নেই। হাসপাতাল সুপার শঙ্করপ্রসাদ মাহাতো বলেন, ‘‘কিডনির অসুখ নিয়ে বহু মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে আসেন। এখানে ডায়ালিসিসের ব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের বারাসতে পাঠিয়ে দেওয়া হত। এখন থেকে আর বারাসতে রোগীদের যেতে হবে না। পুরসভার সেন্টারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। বনগাঁর মানুষের জন্য এটা বড় প্রাপ্তি।’’ কিছু দিন আগে পুরসভার তরফে বসানো হয়েছে সিটি স্ক্যান মেশিন। ওই সুবিধা হাসপাতালে নেই। শহরবাসীর অনেকের বক্তব্য, ‘‘সবই যখন হল, তখন এমআরআই সুবিধা আর বাকি থাকে কেন!’’ 

পুরপ্রধানের কাছে অনেকেরই এই অনুরোধ রয়েছে। শঙ্কর বলেন, ‘‘এমআরআই-এর বিষয়টি নিয়েও আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।’’