হালিশহরের তিন কাউন্সিলরও যোগ দিলেন পদ্মশিবিরে
সকালে তৃণমূলের প্রচারে, দুপুরে বিজেপিতে রাজা দত্ত
বিজেপিতে যোগ দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বীজপুর থানার পুলিশ সুদীপ্তকে ধরার জন্য তাড়া করে। তাঁকে জোর করে গাড়ি থেকে নামিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তোলে বিজেপি। এই ঘটনার পরে দলবল নিয়ে বীজপুর থানার সামনে ধর্না শুরু করেন বিজেপির প্রার্থী অর্জুন সিংহ। 
Arjun

সদলবলে: অর্জুন সিংহের সঙ্গে রাজা (ছবিতে ডান দিকে) ও সুদীপ্ত। নিজস্ব চিত্র

বুকে ঘাসফুলের ব্যাজ লাগিয়ে সকালে বিধায়কের সঙ্গে প্রচার করলেন তৃণমূল প্রার্থীর সমর্থনে। দুপুরে হাজির বিজেপি নেতা মুকুল রায়ের বাড়িতে। সেখানে গিয়েই বিজেপিতে যোগ দিলেন হালিশহরের উপ-পুরপ্রধান রাজা দত্ত। তাঁর সঙ্গে দল ছেড়ে বিজেপিতে গেলেন হালিশহর পুরসভার আরও তিন কাউন্সিলর। বন্ধুগোপাল সাহা, মহাদেব বিশ্বাস এবং সুনীতা বিশ্বাস নামে ওই তিনজন রাজা-ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। পদ্ম শিবিরে গিয়েছেন তৃণমূলের আরও এক বিতর্কিত যুব-নেতা সুদীপ্ত দাস। 

শুক্রবার এই ঘটনার পরেই ধুন্ধুমার বাধে কাঁচরাপাড়ায়।

অভিযোগ, বিজেপিতে যোগ দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বীজপুর থানার পুলিশ সুদীপ্তকে ধরার জন্য তাড়া করে। তাঁকে জোর করে গাড়ি থেকে নামিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তোলে বিজেপি। এই ঘটনার পরে দলবল নিয়ে বীজপুর থানার সামনে ধর্না শুরু করেন বিজেপির প্রার্থী অর্জুন সিংহ। 

অর্জুন বলেন, “নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছি, যাতে ব্যারাকপুর কমিশনারেটের সব থানা তল্লাশি করা হয়। থানার মধ্যে অবৈধ অস্ত্র এবং মাদক মজুত করে রাখা হয়েছে। বিজেপি নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করে সে সব তাঁদের নামে দেখানো হচ্ছে।” 

পুলিশ জানিয়েছে, সুদীপ্তর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। অর্জুনের প্রশ্ন, এত দিন ধরে সেই অভিযোগ থাকলেও পুলিশ সুদীপ্তকে ছোঁয়নি কেন? তিনি বিজেপিতে যোগ দিতেই পুলিশ তাঁকে পাকড়াও করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। অর্জুনের দাবি, তিনি নির্বাচনের কমিশনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন।

গত নভেম্বরে কালীপুজোর সময়ে এলাকা দখল নিয়ে সংঘর্ষ বেধেছিল তৃণমূলের দুই যুব নেতা সুদীপ্ত এবং রাজা সরকারের। বোমাবাজিতে জখম হয় চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রী। তার পরেই পুলিশ অর্জুন ঘনিষ্ঠ দুই নেতাকে গ্রেফতার করে। অর্জুনই তাঁদের জামিনের ব্যবস্থা করেছিলেন। সে সময়ে প্রবল মুকুল বিরোধী অর্জুন বলেছিলেন, “কাঁচরাপাড়ায় মকুল রায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো দু’টো ছেলে তৈরি হয়ে গিয়েছে।” বিজেপিতে যোগ দিয়ে অর্জুন-মুকুল সমীকরণ বদলেছে। অর্জুনের হাত ধরে সুদীপ্ত এ দিন মুকুলের হাত থেকেই পদ্ম-পতাকা নিয়েছেন বলে বিজেপির একটি সূত্রে জানা যাচ্ছে। রাজাকে নিয়েও তৃণমূলের অন্দরে কম জলঘোলা হয়নি। নানা ঘটনায় অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। কিন্তু পুলিশের হাতে ধরা পড়েননি এক সময়ে হালিশহরের ‘বেতাজ বাদশা’ রাজা। পুকুর ভরাট থেকে, বালি পাচার, অপরহণ থেকে শুরু করে টাকার বিনিময়ে চাকরি— তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত ছিল না। কিন্তু তৃণমূলের একদা ‘নম্বর-টু’ মুকুলের ঘনিষ্ঠ রাজাকে ছোঁয়ার সাহস করেনি কেউ। মুকুল দল ছাড়ার পরেও রাজা ছিলেন অধরাই। 

গত বিধানসভা ভোটের আগের রাতে সিপিএম সমর্থক এক পরিবারের উপরে হামলা চালানোর পরে রাজার বিরুদ্ধে সরব হন হালিশহরের বাসিন্দাদের একাংশ। তারপরে একের পর এক অভিযোগ উঠতে থাকে তাঁর বিরুদ্ধে। টাকা নিয়ে চাকরি না দেওয়ার অভিযোগে জনরোষ তৈরি হয় রাজাকে ঘিরে।

এক সময়ে হালিশহর ছাড়া হতে হয় রাজাকে। পুলিশও তাঁর খোঁজ শুরু করে। তৃণমূলের একটি সূত্র জানাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত তিনি শহরে ফিরেছিলেন তৃণমূলের বাহুবলী বিধায়ক অর্জুন সিংহের হাত ধরে। তবে তৃণমূল সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁর প্রত্যাবর্তনে ছাড়পত্র দিয়েছিলেন দলের উপর তলার নেতারাই। পুরসভায় নিজের চেয়ারে বসে কাজকর্মও শুরু করেন রাজা। কিন্তু পুলিশের চোখে তখনও ‘অধরা’ই ছিলেন এই তৃণমূল নেতা। রাজাকে ভোটের কোনও দায়িত্ব দেয়নি তাঁর দল। কিন্তু তিনি যে পদ্মশিবিরের দিকে ঢলে পড়বেন, সে কথা কার্যত আঁচ করতে পারেননি দলের নেতারা। রাজার বিরুদ্ধে এ বার পুলিশ কোনও পদক্ষেপ করে কিনা, সেটাই দেখার। ব্যারাকপুর কমিশনারেটের এক পুলিশ কর্তার কথায়, ‘‘ওঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে। সময় মতোই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

তৃণমূলের এক নেতা জানান, শুক্রবার সকালে হালিশহরের  ৯, ১০, ১১ এবং ১২ নম্বর ওয়ার্ডে পদযাত্রা করেন বীজপুরের বিধায়ক, মুকুল-পুত্র শুভ্রাংশু রায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পুরপ্রধান অংশুমান রায় এবং রাজা। প্রচার শেষে অংশুমানের ওয়ার্ড অফিসে বসে এক সঙ্গে চা খান রাজা। পরবর্তী প্রচারের পরিকল্পনা করেন। রাজা ঘনিষ্ঠেরা বলছেন, সেখান থেকেই তিনি সটান মুকুল রায়ের বাড়িতে যান।