তেষ্টার মুখে এক গ্লাস জল মুখে তুলতে দু’বার ভাবতে হয় এখানকার মানুষকে। কিন্তু উপায় নেই। আর্সেনিকের বিষ মিশে আছে জেনেও সেই জলই পান করতে বাধ্য হন উত্তর ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ অংশের মানুষ।

আর্সেনিক দূষণ প্রতিরোধ কমিটি সূত্রে জানা গেল, জেলার ২২টি ব্লকই কমবেশি আর্সেনিক-প্রবণ। তবে ভয়াবহ পরিস্থিতি গাইঘাটা, হাবড়া ১, দেগঙ্গা, বাদুড়িয়া ও বসিরহাট ১ ব্লকে।  ১৯৯১ সাল থেকে আর্সেনিকের বিষে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন ২১৬ জন মানুষ। এখনও বহু মানুষ আক্রান্ত। 

কমিটির রাজ্য সম্পাদক অশোক দাস বলেন, ‘‘সরকার ভূগর্ভস্থ জলকে আর্সেনিক-মুক্ত জলের জন্য ব্যবহার করছে। কিন্তু ভূগর্ভস্থ জলে আর্সেনিকের পরিমাণ অনেক বেশি। একমাত্র ভূপৃষ্ঠের জল ব্যবহার করলে আর্সেনিক-সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।’’ বিষয়টি সরকারকে অনেকবার বলা হয়েছে বলেও জানান তিনি। 

আর্সেনিক নিয়ে কয়েক বছর আগেও সচেতন ছিলেন না মানুষ। ১৯৯৫ সালের আগে পর্যন্ত এ সব নিয়ে কেউ মাথা ঘামাননি বলে দাবি আর্সেনিক দূষণ প্রতিরোধ কমিটির। কিন্তু এখন যখন বেশির ভাগ মানুষ সমস্যার কথা জানেন, তখনও স্থায়ী সমাধান হয়েছে— তা নয়। হাবড়ার টুনিঘাটার একটি মানবাধিকার সংগঠন নলকূপের আর্সেনিক-যুক্ত পানীয় জল পান না করার জন্য মানুষকে সচেতন করছেন। সংগঠনের কর্তা সঞ্জীব কাঞ্জিলাল বলেন, ‘‘ওই নলকূপগুলি সিল করে দেওয়া ও বিকল্প পানীয় জলের ব্যবস্থা করার আবেদন জানিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে কয়েকবার চিঠি দিয়েছি। কিন্তু সমাধান হয়নি।’’ 

সমস্যা মেটাতে এখনও পর্যন্ত কী ধরনের পদক্ষেপ চোখে পড়েছে? সচেতনতার কাজ যাঁরা করেন, তাঁরা জানাচ্ছেন, কোথাও সাধারণ টিউবওয়েলের বদলে গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। আর্সেনিক-মুক্ত পানীয় জলের প্ল্যান্টও বসেছে কিছু জায়গায়। কিন্তু অভিযোগ, গভীর নলকূপের জলেও উচ্চমাত্রায় আর্সেনিক রয়েছে। সে জল নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। হাবড়া এলাকায় কিছু পানীয় জলের কলে সরকারি ভাবে সর্তকীকরণ বোর্ড ঝোলানো হয়েছে। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় সেই জল পান করা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেননি মানুষ।

গোবরডাঙা, হাবড়া, বাগদা, অশোকনগর, বারাসত, দেগঙ্গা, বসিরহাট, গাইঘাটার অনেক মানুষ এখন জল কিনে খান। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বোতলবন্দি জলের ব্যবসার রমরমা। প্রচুর বেআইনি প্ল্যান্টও চলছে। যাদের উপযুক্ত কারিগরি, কাগজপত্র কিছুই নেই। যে জল বাজারে বিক্রি হচ্ছে, তার গুণাগুণ নিয়মিত পরীক্ষা হয় না বলেও অভিযোগ। মাঝে মধ্যে অবশ্য বেআইনি জলের প্ল্যান্ট বন্ধ করতে এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ, পুলিশ অভিযান চালায়। কিছু কারখানা সিলও করা হয়। ধরপাকড় চলে। কিন্তু তারপরেও অসংখ্য সংস্থা বাড়ি বাড়ি জল বিক্রির ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

অশোকের অভিযোগ, ‘‘আর্সেনিক দূষণ প্রতিরোধে ডান-বাম কোনও সরকারই ঠিক মতো পদক্ষেপ করেনি। আর্সেনিক রোগীদের চিহ্নিত করে তাঁদের  উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়নি। আক্রান্তদের প্রোটিন ও ভিটামিন-যুক্ত খাদ্য জরুরি।’’ অতীতে এসএসকেএম ও কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আর্সেনিক রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যবস্থা ছিল। বছর চারেক আগে তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বারাসত জেলা হাসপাতালে আর্সেনিক রোগীদের চিকিৎসার জন্য ক্লিনিক থাকলেও বাস্তবে সেখানে কোনও পরিষেবা মেলে না বলে অভিযোগ। জেলাতে আর্সেনিক রোগী শনাক্ত  করার জন্য সরকারি পদক্ষেপ নেই। একমাত্র গাইঘাটা ব্লকে সম্প্রতি স্বাস্থ্য দফতরের তরফে আর্সেনিক-আক্রান্ত শনাক্তকরণের কাজ হচ্ছে।      

আর্সেনিক দূষণ প্রতিরোধ  কমিটির তরফে জেলার বেশ কিছু গভীর নলকূপের জল সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, তাতে আর্সেনিকের উপস্থিতি স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেশি। পাইপ লাইনের জলেরও একই অবস্থা। কমিটির দাবি,  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) মতে, প্রতি লিটার জলে ০.০১ মিলিগ্রামের বেশি আর্সেনিক থাকলে তা পান বা রান্নার কাজে ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু উত্তর ২৪ বহু প্রান্তে এই মাত্রা তুলনায় অনেক বেশি। আর্সেনিক বিশেষজ্ঞেরা জানাচ্ছেন, জেলায় প্রচুর নদী-খাল-বিল-বাওর-পকুর রয়েছে। সেই জল ধরে রেখে ব্যবহার করতে পারলে আর্সেনিক দূষণের সমস্যা মিটবে। ভূপৃষ্ঠের জলে আর্সেনিক নেই। বৃষ্টির জলেও নয়। উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের জনস্বাস্থ্য কর্মাধ্যক্ষ জ্যোতি চক্রবর্তী বলেন, ‘‘আর্সেনিক-সমস্যা দূর করতে জেলাতে ১২১টি প্ল্যান্ট বসানো হয়েছে। এ ছাড়া, এডিবির টাকায় হাড়োয়া, রাজারহাট, ভাঙড় এলাকায় প্রকল্প তৈরির কাজ চলছে।’’ জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গিয়েছে, নৈহাটি থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে গঙ্গার জল নিয়ে আসার কাজ চলছে। ওই জল পরিস্রুত করে পানীয় হিসাবে গাইঘাটা, দেগঙ্গা, হাবড়া, অশেকনগর, বারাসত-সহ সাতটি পঞ্চায়েত সমিতি এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হবে। এ ছাড়া, নদিয়ার চাকদার গঙ্গা থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে গঙ্গার জল আনার কাজ চলছে। এর ফলে বনগাঁ ও বাগদার মানুষ উপকৃত হবেন। জ্যোতি বলেন, ‘‘প্রকল্পগুলির কাজ শেষ হলে জেলাকে আর্সেনিক-মুক্ত হিসাবে ঘোষণা করা হবে।’’ ২০২১ সালের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা বলে জানিয়েছেন তিনি।