তাঁদের বাড়ি আলাদা জায়গায়। পেশাও আলাদা। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা এক করে দিল তাঁদের।

বুধবার ভোরে বর্ধমান আরামবাগ রাজ্য সড়কের গৌরাঙ্গ রোডে ট্রাকের সঙ্গে মালবাহী গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছেন চার জন। শোকস্তব্ধ চারটে পরিবারই মনে করছে, গাড়িটা ট্রাককে ওভারটেক না করলে এমনটা হয়তো হতো না।

স্বামী ধীরেনবাবু প্রতিবন্ধী হওয়ার পরে মাছ বিক্রি করে সংসারের হাল ধরেন খণ্ডঘোষের সাঁকো গ্রামের সাগরিতা সিংহ। প্রতিদিন ভোরে বর্ধমানের তেঁতুলতলা বাজার থেকে মাছ কিনে এনে রায়নার সেহেরাবাজারে বিক্রি করতেন তিনি। এখন সগড়াই মোড়ের বাজারে রাস্তার ধারে ত্রিপল বিছিয়ে মাছ বিক্রি করেন। তাঁর ছেলে বাপনও সাইকেলে ঘুরে মাছ বিক্রি করেন। এ দিন মাকে নিয়ে সাইকেলে সগড়াই পর্যন্ত যায় বাপন। সেখানে সাইকেল রেখে ওই মালবাহী গাড়িতে চাপেন তাঁরা। বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি বাপনের কথায়, “একসঙ্গেই ছিলাম। কিন্তু মা আর ফিরবে না।’’ বাডিতে বসে ধীরেনবাবুও বলেন, “ঘুম ভাঙার পরেই বর্ধমান যেতে বারণ করেছিলাম। শুনল না।”

খণ্ডঘোষের জরুল গ্রামের বাদলচন্দ্র দত্তেরও ভরা সংসার। স্ত্রী-দুই ছেলে, বৌমাদের নিয়ে দোতলা পাকা বাড়িতে থাকতেন তিনি। আমিলা বাজারে তাঁর আনাজের দোকান। বড় ছেলে অনুপের চা-ঘুগনির দোকান রয়েছে। ছোট ছেলে প্রণব একটি লেদ কারখানায় কাজ করেন। মৃতের পরিজন অমিত দত্ত, তপন দত্তদের কথায়, “অন্য দিন বাসে করে যায়। এ দিনই বাস ধরতে না পারায় মালবাহী গাড়িতে চেপেছিল। তখন কী আর জানত, এমন হবে! গাড়িটা ওভারটেক না করলে হয়তো এমন হতো না।’’ বাদলবাবুর স্ত্রী প্রতিমা দত্ত বলে ওঠেন, “সবই কপাল।”

সপ্তাহে দু’দিন বর্ধমানে গিয়ে পুরনো চটের বস্তা, টিন বিক্রি করতেন খণ্ডঘোষের চন্দ্রপল্লির অশোক পোদ্দার। এ দিন ছোট ছেলে আমনকে নিয়ে বর্ধমান যাচ্ছিলেন তিনি। অশোকবাবু ঘটনাস্থলে মারা গেলেও বেঁচে গিয়েছে ছোট আমন। বিহারের বেগুসরাই থেকে কর্মসূত্রে এসে সেহেরাবাজর রেল লাইনের ধারে বাড়ি করেছিলেন তিনি। ২০০৫ সালে বিডিআর লাইন হওয়ার সময় বাড়ি ভাঙা পরে, তখন থেকে ওই গ্রামে বাড়ি ভাড়া নিয়ে রয়েছেন তিনি।

বাসের কন্ডাক্টর রামপ্রসাদ নায়েকও এ দিন মিরেপোতা থেকে ওই মালবাহী গাড়িতে বর্ধমান যাচ্ছিলেন। তাঁর ষষ্ঠ শ্রেণিতে পাঠরতা একটি মেয়ে রয়েছে।

বর্ধমান আরামবাগ রাজ্য সড়কের ধারে বাবরকপুর গ্রাম দুর্ঘটনা দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু ভোরবেলা একসঙ্গে তিন জনের মৃত্যু ওই গ্রামের রোজনামচাও স্তব্ধ করে দিয়েছে। বেলা ১১টার মধ্যেই চারিদিক সুনসান হয়ে গিয়েছে। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা লাল্টু শেখ, সীমা শর্মদের কথায়, “ভোরের দিকে এত জোরে আওয়াজে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। বেরিয়ে দেখি গাড়ির রবাই কাতরাচ্ছে। পুজোর আগে এতগুলো পরিবারের এমন হাল দেখে মনটা ভাল নেই আমাদেরও।’’

তাঁদের কথায়, ‘‘সকালে যে যার কাজে গাড়িতে উঠেছিলেন। বিকেলে গাড়ি থেকেই তাঁদের দেহ নামল।’’