আসানসোল লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত এই বিধানসভা এলাকার একটা বড় অংশের নাগরিক বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক। তাঁদের বেশির ভাগই আবার ঠিকা শ্রমিক। ভোটের মুখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রচারের অন্যতম লক্ষ্য, এই শ্রমিক-ভোট। প্রচারে উঠে আসছে, ন্যূনতম মজুরি, শ্রমিক নিরাপত্তা-সহ বেশ কিছু বিষয়।

বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন সূত্রে জানা যায়, জামুড়িয়া শিল্পতালুকে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২৯টি বেসরকারি কারখানা রয়েছে। সেগুলির বেশির ভাগই স্পঞ্জ আয়রন কারখানা। এ ছাড়া রয়েছে সিমেন্ট, বিস্কুট, পেরেক প্রভৃতির কারখানা। কারখানাগুলিতে কর্মীর সংখ্যা পাঁচ হাজার। এর মধ্যে ঠিকা শ্রমিকই রয়েছেন চার হাজার জন।

প্রচারের নেমে ভোটের বিচারে বরাবরের শক্ত বাম ঘাঁটি জামুড়িয়ায় সিপিএম নেতা, কর্মীরা অভিযোগ করছেন শ্রম-চুক্তি অনুযায়ী শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হয় না। সিটু নেতা মনোজ দত্ত জানান, ২০১৬-য় কারখানা কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলির সঙ্গে শ্রম দফতরের বৈঠকে ঠিক হয়, স্থায়ী, অস্থায়ী কর্মীদের ৩০৬ টাকা করে দৈনিক বেতন দেওয়া হবে। সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৯-র মার্চে। পূর্ব নির্ধারিত চুক্তিও মানা হয়নি, শ্রমিকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সে কথা বলছেন শ্রমিক নেতৃত্ব। তাঁদের অভিযোগ, স্থায়ী কর্মীরা দৈনিক ২৬০ টাকা, ঠিকাকর্মীরা দৈনিক ১৮০ থেকে ২২০ টাকা বেতন পান। আরও অভিযোগ, ঠিকাকর্মীদের আট ঘণ্টার মজুরি দিয়ে ১২ ঘণ্টা কাজ করানো হচ্ছে। সিপিএম প্রার্থী গৌরাঙ্গ চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষোভ, ‘‘কেন্দ্রীয় ও রাজ্য দুই সরকারের জন্যই শ্রমিকদের এই অবস্থা, এটাই আমরা বলছি।’’ সেই সঙ্গে প্রতিশ্রুতি, বেতনবৃদ্ধির ও নানা প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ারও।

যদিও তৃণমূল প্রচারে নেমে শ্রমিকদের এই অবস্থার জন্য দায়ী করছে সিটু ও সিপিএম নেতৃত্বকেই। জামুড়িয়ায় তৃণমূলের নেতা সাধন রায়ের অভিযোগ, ‘‘কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সিটু নেতৃত্ব আপস করাতেই শ্রমিকদের এই হাল। শ্রমিকদের সেটা আমরা বলছিও। শ্রমিকদের জন্য আমরা লাগাতার আন্দোলন করছি।’’ অভিযোগ অস্বীকার করে সিটু নেতা মনোজবাবু অভিযোগ করেন, কারখানা কর্তৃপক্ষ শাসক দলের মদতেই শ্রমিকদের মজুরি ঠিক মতো দিচ্ছেন না। যদিও শিল্পতালুকের কারখানা মালিক সংগঠনের সভাপতি পবন মাউন্ডিয়ার দাবি, ‘‘চুক্তি মেনেই আমরা যাবতীয় কাজ করি।’’

শ্রমিকদের মধ্যে প্রচারে গিয়ে আইএনটিটিইউসি ও সিটুকে বিঁধে তৃণমূল, সিপিএম-কে নিশানা করছে বিজেপি। বিজেপি নেতা গৌতম মণ্ডলের দাবি, “সিটু, আইএনটিটিইউসি শ্রম চুক্তিতে বড় ভূমিকা নেয়। আমাদের  শ্রমিক সংগঠনের কারখানায় স্বীকৃতি না থাকায় সরাসরি চুক্তিতে অংশ নিতে পারি না।’’ দলের নেতা প্রমোদ পাঠকের দাবি, শ্রমিক-সহ এলাকার ৩৫ হাজার পরিবারকে তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের নানা প্রকল্পের সুযোগ পাইয়ে দিয়েছেন।

প্রচারের ‘ইস্যু’ যা-ই হোক না কেন, এই এলাকার ভোট-অঙ্কও মাথায় রাখছেন রাজনৈতিক নেতা, কর্মীরা। ১৯৭৭ সাল থেকে এ যাবৎ বিধানসভা ভোটে এই কেন্দ্রে জিতেছেন সিপিএম প্রার্থী। ২০১৪-র লোকসভাতেও এই এলাকা থেকে সামান্য ‘লিড’ পেয়েছিলেন সিপিএম প্রার্থী।

কিন্তু এ বার পরিস্থিতি ভিন্ন বলে দাবি তৃণমূল ও বিজেপি নেতৃত্বের। তৃণমূলের দাবি, গত পঞ্চায়েত ভোটেই প্রমাণিত হয়েছে জামুড়িয়ার সমর্থন তাঁদের দিকে। যদিও বিরোধীদের অভিযোগ, সেই ফলের কারণ তৃণমূলের সন্ত্রাস। অভিযোগ অস্বীকার করে তৃণমূলের জেলা সভাপতি ভি শিবদাসন বলেন, ‘‘পঞ্চায়েত ও পুরসভার নানা উন্নয়নমূলক কাজের জোরেই আমরা জিতব।’’ যদিও সিপিএম নেতা তাপস কবির দাবি, ‘‘জামুড়িয়ায় লাল পতাকা ছাড়া কারও জায়গা নেই।’’ বিজেপি নেতা প্রমোদবাবুর দাবি, তাঁদের সাংগঠনিক উপস্থিতি এই এলাকায় অনেকটাই বেড়েছে। অতীতে তিনটি মাত্র দলীয় কার্যালয় থাকলেও এখন সেই সংখ্যা বেড়ে পাঁচটি হয়েছে। 

এই পরিস্থিতিতে ২৩ মে কে শেষ হাসি হাসেন, সেটাই দেখার।