তিন ফসলি জমি বাঁচাতে বেঙ্গালুরু থেকে চাকরি ছেড়ে চলে এসেছিলেন কাটোয়ার গ্রামে। গতি হারিয়েছে সেই আন্দোলন। প্রকল্প চালু হলে এখন জমি দিতে রাজি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র উৎপল গুপ্ত। কিন্তু প্রকল্প থমকে রয়েছে।

কর্মসংস্থানের আশায় বিঘা চারেক জমি দিয়েছিলেন সমীরণ দাস। জমানো টাকা এখন ফুরোতে চলেছে। এর পরে কী ভাবে সংসার চলবে, দিন কাটছে দুশ্চিন্তায়।

জমি গিয়েছে, চাকরিও মেলেনি— আক্ষেপ পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ায় এনটিপিসি-র প্রস্তাবিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকায়। ভোটের মরসুমে ক্ষমতায় এলে প্রকল্প চালুর ব্যাপারে পদক্ষেপের আশ্বাস দিচ্ছে নানা পক্ষ। কিন্তু কাজের কাজ আদৌ কতটা হবে, সংশয় কাটছে না শ্রীখণ্ড, দেবকুণ্ডু, কোশিগ্রাম, চুড়পুনি, রাজুয়া গ্রামের বাসিন্দাদের।

ওই গ্রামগুলির বাসিন্দাদের দাবি, গোড়ায় ‘কৃষি ও কৃষক বাঁচাও’ কমিটি তৈরি হলেও বছর তিনেকের মধ্যেই তাদের কর্মকাণ্ড কমে আসে। প্রকল্পের জন্য কৃষকেরা জমি দিতে শুরু করেন। ৬৬০ মেগাওয়াট করে দু’টি ইউনিটের জন্য ৮০০ একর জমি প্রয়োজন। প্রায় চার হাজার কৃষকের কাছে জমি কেনার কথা এনটিপিসি-র। মূল প্ল্যান্টের জন্য অধিগৃহীত ৫৫৬ একর জমি এনটিপিসি-র হাতে তুলে দিয়েছে রাজ্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম। এ ছাড়া, রাজ্য সরকার ১০০ একর জমি দিয়েছে। বাকি প্রায় দেড়শো একরের মধ্যে ১২ একর এখনও এনটিপিসি-র হাতে আসেনি। এর মধ্যে বর্ষার জল বেরনোর জন্য ২১ একর জমি কিনতে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে তারা। সংশ্লিষ্ট জমির মালিকেরা জমি দিতে রাজি হয়ে এনটিপিসি-কে চিঠিও দিয়েছেন।

চুড়পুনির বাসিন্দা, বছর চুয়াল্লিশের উৎপলবাবু বলেন, ‘‘পাঁচ বিঘা জমি এনটিপিসি-কে দিইনি। আমার মতো অনেকেই আন্দোলনে নেমেছিলেন। পরে চাকরির আশায় জমি দেন। এখন আমাদের না আছে চাকরি, না জমি!’’ অনিল দাস, অমল দাসদের দাবি, “গত কয়েক বছরে এলাকার অন্তত পাঁচশো যুবক কাজের খোঁজে গ্রাম ছেড়েছেন।’’ চাষি থেকে খেতমজুর, অনিশ্চয়তায় ভুগছেন সকলেই।

২০০৫ সাল থেকে প্রক্রিয়া শুরু হলেও এখনও প্রকল্প চালু হল না কেন? এনটিপিসি-র এক কর্তার দাবি, পরিকাঠামোর দিক থেকে কাটোয়ার প্রকল্প তৈরি রয়েছে। কয়লা মন্ত্রক কয়লা দিতে সম্মতি জানিয়েছে। শ্রীখণ্ডে কয়লার রেক রাখার জন্য ছ’টি লাইন তৈরি হয়েছে। সেখান থেকে মাটির নীচ দিয়ে ছোট-ছোট রেকে মূল কেন্দ্রে কয়লা পৌঁছনোর প্রস্তাবও অনুমোদন হয়েছে। প্রকল্প শুরুর পর্বে যাঁরা ছিলেন, তেমন কিছু কর্মী-অফিসারকে কাটোয়ায় ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হতে চলেছে সংস্থার তরফে। এনটিপিসি-র ওই কর্তার বক্তব্য, ‘‘এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এর অভাবেই বারবার প্রকল্প শুরু হওয়া পিছিয়ে গিয়েছে।’’ 

বাসিন্দাদের অভিযোগ, পঞ্চায়েত থেকে লোকসভা—প্রত্যেক ভোটের সময়েই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির তর্জা শুরু হয়ে যায়। এ বারও তার ব্যতিক্রম নেই বোলপুর লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত এই এলাকায়। সিপিএম প্রার্থী রামচন্দ্র ডোমের দাবি, প্রকল্পের জন্য বিগত বাম সরকার প্রাথমিক পরিকাঠামো তৈরি করে দিয়েছিল। তার ভিত্তিতেই বর্ধমান-কাটোয়া ও আমোদপুর-কাটোয়া রেললাইনের উন্নতিকরণ হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, ‘‘গত কয়েক বছরে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার কী করেছে? অধিগৃহীত জমি শ্মশানে পরিণত হয়েছে। এলাকার ছেলেদের কাজের খোঁজে বাইরে যেতে হচ্ছে। আমরা প্রকল্প চালুর দাবি তুলছি প্রচারে।’’ 

কাটোয়ার তৃণমূল বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের অবশ্য বক্তব্য, ‘‘এই প্রকল্প নিয়ে আমরা গোড়া থেকেই আন্তরিক। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একশো একর জমি এনটিপিসি-কে তুলে দিয়েছেন।’’ দলের প্রার্থী অসিত মালের অভিযোগ, বাংলাকে বঞ্চনা করার জন্য কেন্দ্র এই প্রকল্পে নজর দেয়নি। বিজেপি প্রার্থী রামপ্রসাদ দাসের পাল্টা অভিযোগ, ‘‘রাজ্য সরকারের টালবাহানায় খরচ দিন-দিন বেড়েছে, প্রকল্প পিছিয়ে যাচ্ছে। আমরাও চাই, দ্রুত এই প্রকল্পের কাজ শুরু হোক।’’