সকাল-সকাল পোড়া বাড়িতে ছড়িয়ে থাকা ছাইয়ের গাদায় হাতড়াচ্ছিলেন সাহিনুর বিবি। কী খুঁজছেন? মহিলার উত্তর, ‘‘মেয়ের বিয়ের জন্য কয়েক ভরি সোনা আর বেশ কয়েক হাজার টাকা জমিয়েছিলাম। দেখছি কিছু বেঁচে আছে কি না। এখনও কিছু পাইনি।’’

এক বছরের ছেলেকে কোলে নিয়ে ছাই ঘাঁটছিলেন সোনাবানু বিবি। জানালেন, আত্মীয়েরা তাঁর ছেলেকে কিছু গয়না দিয়েছিলেন। তাঁর নিজেরও বেশ কিছু গয়না ছিল। টাকাও ছিল বাড়িতে। সোমবার সন্ধ্যায় দমকল আগুন নিভিয়ে যাওয়ার পর থেকে খুঁজে চলেছেন। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত কিছুই পাননি।

আগুন লেগে ৮৬টি বাড়ি পুড়ে যাওয়ার পরের দিন, মঙ্গলবার পূর্বস্থলীর ধরমপুর গ্রাম জুড়ে শুধুই বাসিন্দাদের হা-হুতাশ। সোমবার দুপুরে একটি বাড়িতে গ্যাসের সিলিন্ডার ফেটে আগুন লাগে। দমকা হাওয়ার জেরে সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে উত্তরপাড়া ও মুসলিমপাড়ায়। একের পর এক ভস্মীভূত হয়ে যায় টিনের চাল ও মাটির বাড়িগুলি। দু’টি পাড়ায় দু’টি ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছে। তবে সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত সব পরিবারের ঠাঁই হয়নি। সোমবার রাতে অনেকে কাটিয়েছেন আত্মীয়ের বাড়িতে। অনেকে আবার পোড়া বাড়ি চত্বরে থেকে গিয়েছেন, খোঁজাখুঁজি চালিয়েছেন।

নতুন বই হাতে গ্রামের পরীক্ষার্থীরা।

মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হতে আর সপ্তাহখানেক বাকি। কিন্তু কী ভাবে পরীক্ষা দেবে, চিন্তায় পড়েছে আলাউদ্দিন মণ্ডল, সুমন শেখ, আজিজা খাতুন, রসুল খাতুনেরা। আগুনে তাদের সব বই, খাতাপত্র পুড়ে গিয়েছে। গ্রামে মোট ছ’জন মাধ্যমিক, চার জন উচ্চ মাধ্যমিক ও দু’জন একাদশ শ্রেণির পরীক্ষার্থী রয়েছে। এ ছাড়াও নানা ক্লাসের অনেক পড়ুয়া রয়েছে। সোমবার থেকে সবারই পড়াশোনা শিকেয়।

মঙ্গলবার স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর উদ্যোগে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের হাতে নতুন বইপত্র তুলে দেওয়া হয়। তবে আলাউদ্দিনেরা বলে, ‘‘খাতায় শিক্ষকদের লেখানো নানা নোট ছিল। পরীক্ষার জন্য সেগুলো খুব দরকারি ছিল। সে সব তো আর পাব না!’’ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী কাপনুর খাতুন বলে, ‘‘বইপত্র বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু এত ভয়াবহ ভাবে আগুন ছড়াচ্ছিল যে কিছু বের করে আনতে পারিনি।’’ সে জানায়, তার মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড, মার্কশিটও নষ্ট হয়ে গিয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা জানান, সোমবার তাঁরা কোনওমতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের প্রাণ বাঁচান। জিনিসপত্র প্রায় কিছুই বাঁচাতে পারেননি। মৃত্যু হয়েছে বেশ কিছু গবাদি পশুরও। রাতটা ত্রাণ শিবির বা আত্মীয়ের বাড়িতে কাটিয়েই সকাল-সকাল বাসিন্দারা পোড়া বাড়ির সামনে জড়ো হন। কিছু জিনিস অক্ষত অবস্থায় ধ্বংসস্তূপ থেকে পাওয়া যেতে পারে, এই আশায় দিনভর পোড়া টিন সরিয়ে ছাইয়ের গাদায় খোঁজাখুঁজি করেন তাঁরা। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিফল হতে হয়েছে। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে।

ত্রাণ শিবিরগুলিতে নিমদহ পঞ্চায়েতের তরফে রান্নার ব্যবস্থা হয়েছে। এ দিন দুপুরে ভাত, ডাল, সয়াবিনের তরকারি খাওয়ানো হয় পরিবারগুলিকে। ত্রাণ শিবিরে জায়গা না পাওয়া বাসিন্দাদের জন্য উত্তরপাড়া ও মুসলিমপাড়ায় তাঁবু খাটানো শুরু করেছে প্রশাসন। ট্যাঙ্কার ও পাউচে জল সরবরাহের ব্যবস্থা হয়েছে। এ দিন ৮৬টি পরিবারকে মশারি, ৫০ কিলোগ্রাম করে চাল, জামাকাপড়, ত্রিপল বিলি করা হয় ব্লক প্রশাসনের তরফে।

পঞ্চায়েত ভোটের আগে এমন ঘটনায় গ্রামে আসা-যাওয়া করছেন রাজনৈতিক দলের নেতারাও। কালনা মহকুমা কংগ্রেস সভাপতি রবীন্দ্রনাথ মণ্ডলের অভিযোগ, ‘‘প্রশাসন খাবারের ব্যবস্থা করেছে ঠিকই। কিন্তু এর পরে কোথায় থাকবেন, সে নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা। দ্রুত বাড়ি দেওয়ার জন্য মহকুমাশাসকের কাছে আর্জি জানাব।’’ এলাকার সিপিএম বিধায়ক প্রদীপ সাহা বলেন, ‘‘বিধানসভায় বিষয়টি জানিয়েছি। দলের তরফেও মানুষের পাশে থাকা হবে।’’ 

এ দিন বিকেলে গ্রামে যান রাজ্যের মন্ত্রী তথা জেলা তৃণমূল সভাপতি স্বপন দেবনাথ। তিনি বলেন, ‘‘বাংলা আবাস যোজনায় ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়ি দেওয়ার জন্য প্রশাসনকে জানিয়েছি। প্রাণিসম্পদ ও কুটিরশিল্প দফতর থেকেও সাহায্য করার কথা ভাবছি।’’ এলাকার প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক তপন চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘এলাকায় আগে এত বড় অগ্নিকাণ্ড হয়নি। ক্ষতিগ্রস্তেরা যাতে বিপাকে না পড়েন তা প্রশাসন দেখছে। আমাদের কর্মীরাও মানুষের পাশে রয়েছেন।’’

মহকুমাশাসক (কালনা) নীতিন সিংহানিয়া বলেন, ‘‘প্রশাসনের তরফে ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে গ্রামে যাব। তারা যাতে ঠিক ভাবে পড়াশোনা করতে পারে সে জন্য তাদের সেখান থেকে সরিয়ে কোথাও রাখার চেষ্টা চলছে।’’ তিনি জানান, বাড়ি পুড়ে গেলে ১৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা যাতে তা দ্রুত পান, সে জন্য জেলা স্তরে দরবার করা হচ্ছে।