পরিকল্পনা মাফিক চুরির দৃশ্যটি সাজানো হয়েছিল অনেকটা বড়পর্দায় দেখা ‘ক্রাইম থ্রিলার’-এর মতো করে। সিসি ক্যামেরা এড়াতে চোরের মুখ হনুমান টুপি দিয়ে ঢাকা। হাতের ছাপ এড়াতে দস্তানা। সবই ছিল ঠিকঠাক। কিন্তু বাদ সাধল পুলিশের কাছে চুরির অভিযোগ দায়ের করাটাই। তদন্তে নেমে পুলিশ ধরে ফেলল মূল অভিযোগকারী এবং তার দুই সঙ্গীর এই কারসাজি। ধরা পড়ে গেল তিন জনই। উদ্ধার হল চুরি যাওয়া জিনিসও।

ঘটনাটি ঘটেছে হাওড়ার গোলাবাড়ি থানার ডবসন রোডে। হাওড়া সিটি পুলিশ সূত্রে খবর, ২৪ তারিখ ওই এলাকার একটি মোবাইলের দোকান থেকে ১৮ লক্ষ টাকা মূল্যের ১২৩টি মোবাইল চুরি হয় বলে অভিযোগ করেন দোকানের কর্মী সুদীপ ঘোষ। তিনি জানান, দোকানের তালা ভেঙে চুরি হয়েছে। এই অভিযোগ পাওয়ার পরেই একযোগে তদন্ত শুরু করেন গোলাবাড়ি থানা ও সিটি পুলিশের গোয়েন্দা দফতরের অফিসারেরা।

শনিবার হাওড়া সিটি পুলিশের ডিসি (নর্থ) হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিসি (এসবি) কৃষ্ণকলি লাহিড়ী জানান, ঘটনার তদন্তে নেমে শুক্রবার প্রথমে দেবদীপ মহাপাত্র নামে ওই মোবাইল দোকানের এক কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গ্রেফতার করা হয় মূল অভিযোগকারী সুদীপ ঘোষ ও কুলদীপ সিংহকে। তারাও ওই দোকানের কর্মী। ধৃতদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় ১২টি চুরি যাওয়া মোবাইল। শুক্রবারই ধৃতদের হাওড়া আদালতে তোলা হয়েছিল। তাদের পাঁচ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডিসি (নর্থ) জানান, এর মধ্যেই চুরি যাওয়া বাকি মোবাইলগুলি উদ্ধারের চেষ্টা হবে।

কী ভাবে হল এই চুরির কিনারা?

পুলিশ জানায়, ঘটনার তদন্তে নেমে প্রথম থেকেই অভিযোগকারীর বয়ান ও দোকানের সিসি ক্যামেরায় ওঠা চুরির দৃশ্য দেখে তাদের সন্দেহ হয়েছিল যে, চোর দোকানেরই কোনও কর্মী। কারণ সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বেশ ভাল জামা-প্যান্ট, হনুমান টুপি ও হাতে দস্তানা পরে চুরি করতে এসেছে চোর। এ ছাড়া ক্যামেরায় ধরা পড়েছে, দোকানের যে জায়গায় সব মোবাইল রাখা থাকে, চোর অভ্যস্তের মতো অনায়াসে সেখানে চলে গিয়ে সেগুলি বার করে নেয়। এর পরে সঙ্গে আনা একটি ব্যাগে মোবাইলগুলি পুরে নিয়ে ধীরেসুস্থে দোকানের শাটার তুলে বেরিয়ে যায় সে।

এই ছবি দেখার পরে তদন্তকারীরা নিশ্চিত হন যে, দোকানের কোনও কর্মচারীই এই চুরি করেছে। তা না হলে কেউ ওই ভাবে মুখ ঢেকে আসত না এবং অভ্যস্ত ভঙ্গিতে মোবাইলগুলি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে বার করে নেওয়াও সম্ভব হত না। কারণ, দোকান বন্ধের পরে ঠিক কোথায় মোবাইলগুলি রাখা হয়, কর্মচারী ছাড়া তা কারও পক্ষে জানা সম্ভব নয়। পাশাপাশি তদন্তে জানা যায়, অভিযোগকারী তালা ভেঙে দোকানে ঢোকার কথা বললেও পুলিশের কাছে তালা ভাঙার কোনও প্রমাণ সে দেখাতে পারেনি। এ থেকেই পুলিশ বুঝতে পারে, অভিযোগকারীও ঘটনার সঙ্গে কোনও ভাবে জড়িত।

এর পরেই পুলিশ প্রথমে ওই দোকানের কর্মী দেবদীপকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। পুলিশের দাবি, জেরায় ভেঙে পড়ে দেবদীপ চুরির সমস্ত পরিকল্পনার কথা স্বীকার করে। জানায়, বাত্‌সরিক ‘টার্গেট’ মতো মোবাইল বিক্রি না হওয়ায় তারা কোম্পানি থেকে বেতন পাচ্ছিল না। তাই দোকানের মোবাইল বাইরে বিক্রি করে টাকা পকেটে পুরছিল। বছরের শেষে হিসেব দিতে গিয়ে দেখা যায়, সাড়ে চার লক্ষ টাকার মোবাইলের কোনও হিসেব নেই। এ দিকে মার্চ মাসে অডিট হওয়ার কথা। তার আগেই তাই এই চুরির নাটক করার পরিকল্পনা করে তিন জন। কিন্তু পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করার পরেই সব ভেস্তে যায়। ধরা পড়ে যায় তিন জনই।