ধোঁয়া উঠছে ভাতের হাঁড়ি থেকে। অনুষঙ্গ হিসেবে ডাল, আলুভাজা বা সর্ষে দিয়ে বাটা মাছের ঝাল। কাটাতার তৈরির কারখানার সামনে এমন মেনু চেটেপুটে খেতেন সেখানকার শ্রমিকরা। কয়েক বছর আগে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। তার ধাক্কায় পান্নাদার হোটেলেরই ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যায়। আশপাশের পাঁচকড়ির চায়ের দোকান বা বড়দার হোটেলেরও একই পরিণতি হয়। শীতের সকালে এই সব দোকানে বসে গরম চায়ে চুমুক দিয়ে কাজে ঢুকতেন শ্রমিকরা।

শুধু ওই কারখানাই নয়, কোন্নগরের অনেক জায়গাতেই বন্ধ কারখানার আশপাশে হুবহু একই ছবি উঠে এসেছে গত কয়েক দশক ধরে। বন্ধ কারখানার জমিতে শিল্পের পুনরুত্থান হয়নি। আর, তার প্রভাব পড়েছে নাগরিকদের জীবনে।

এক সময় গঙ্গার পশ্চিম তীরের এই জনপদে কারখানার সাইরেন বাজলেই দলে দলে মানুষের ভিড় দেখা যেত সামনের রাস্তায়। হন্তদন্ত হয়ে কাজে ঢুকতেন কারখানার শ্রমিক। গত কয়েক দশক ধরে চেনা সেই ছবিটা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে মলিন হতে শুরু করে। একের পর এক কারখানায় তালা ঝুলে যায়। বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনও কারখানার জমি প্রোমোটারদের হাতে চলে গিয়েছে। কোনও কারখানার যন্ত্রপাতি কার্যত লুঠ হয়ে গিয়েছে। কোথাও বন্ধ কারখানার চৌহদ্দি ঝোপজঙ্গলে ভর্তি। সেখানে সাপখোপ, শেয়ালের বাসা।

এই সব কারখানার শ্রমিকদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। কাজ হারিয়ে সংসার চালাতে ছোটখাট নানা পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা। শ্রমিকদের দুরবস্থার কথা মেনে নেন শ্রম দফতরের অফিসাররাও। ওই দফতর সূত্রের খবর, কোন্নগরে বন্ধ কারখানার বেশ কিছু শ্রমিক সরকারি প্রকল্পে মাসিক ভাতা পাচ্ছেন। তা অবশ্য প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। ফলে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন বহু মানুষ। কোন্নগরের একটি কাপড় রং করার কারখানার শ্রমিক ছিলেন বাসুদেব ধর। তিনি এখন একটি আবাসনে নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করেন। স্বল্প বেতনে কোনও রকমে দিন গুজরান হয়। ওই কারখানাতেই ম্যানেজার ছিলেন বাদল রায়। তিনি হৃদরোগী। তাঁর কথায়, “আমি এখন দিন আনি দিন খাই।” তাঁর মতোই বন্ধ কারখানার বহু শ্রমিকের এক অবস্থা। বন্ধ গদি কারখানা রিল্যাক্সনের শ্রমিক নিমাই মুখোপাধ্যায় বলেন, “আমদের কারখানার সামনে নিমাইদার চায়ের দোকান ছিল। শ্রমিকদের জন্যই রমরমিয়ে চলত। কিন্তু কারখানা বন্ধ হওয়ার পরে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। চটকল লাইনের অনেক হোটেলেরও একই দশা হয়েছে।”

বাম আমল থেকে কোন্নগরের অনেক কারখানাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। জিটি রোড ধরে রিষড়ার দিক থেকে শহরে ঢোকার মুখে হাতিরকুল এলাকায় ভগত্‌ কেমিক্যাল প্রাইভেট লিমিটেডের অধীনে মায়াছায়া কনস্ট্রাকশন প্রাইভেট লিমিটেড এবং পেনন প্রাইভেট লিমিটেড নামে দু’টি কারখানা ছিল। প্রায় চার দশক ধরে সে দু’টিই বন্ধ। ফলে গঙ্গার  পাড়ে সেখানকার প্রায় ১৬ বিঘে জমি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। রিল্যাক্সনের বেশ কয়েক একর জমি স্রেফ পড়ে রয়েছে। তা নিয়ে আইনি জটিলতাও রয়েছে। হাতেগোনা কয়েক জন শ্রমিক হাজিরা দিয়ে বাড়ি চলে যান। সূত্রের খবর, রং তৈরির কারখানা ওয়েল্ডিজ খোলা থাকলেও সেটি ধুঁকছে। এক সময় সেখানে দেড় হাজারেরও বেশি লোক কাজ করতেন। কমতে কমতে তা তলানিতে ঠেকেছে। বন্ধ কারখানার তালিকায় হিউম পাইপেরও নাম রয়েছে। এখন অবশ্য তার চিহ্নমাত্র নেই। কারখানাটি প্রোমোটারদের হাতে চলে যায়। পুর-কর্তৃপক্ষের সাফাই, আগের বোর্ডের আমলেই ওই জমি প্রমোটারদের হাতে চলে যায়। শ্রীদুর্গা কটন মিলে, ওষুধ তৈরির কারখানা র্যালিস ইন্ডিয়া, কাটাতার তৈরির কারখানা ফোর্ট উইলিয়ম, রাসায়নিক তৈরির কারখানা ডিএম কেমিক্যালস তালিকা বাড়তেই থাকে। বর্তমান সরকারের আমলে কোনও কারখানায় তালা না পড়লেও শ্রমিকদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ কমেনি।

রাজ্য সরকার চায়, বন্ধ কল-কারখানার জমিতে শিল্পই গড়ে উঠুক। তাতে এ রাজ্যের শিল্পের চাকা ফের সামনের দিকে গড়াতে শুরু করবে। শিল্পের জন্য জমির হাহাকার রাজ্য জুড়ে। এই বাস্তবে দাঁড়িয়ে পুর-কর্তৃপক্ষ এখন অন্য ভাবে ভাবতে শুরু করেছেন। সেই লক্ষ্যে কাজও শুরু হয়েছে।

কি সেই লক্ষ্য?

জমি যোগানের লক্ষে বন্ধ কল-কারখানাকেই হাতিয়ার করেছেন তাঁরা। ওই এলাকার আটটি বন্ধ কারখানার কর্তৃপক্ষকে ইতিমধ্যেই চিঠি দিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, ওই সব জমিতে যাঁরা নতুন শিল্প গড়তে চাইবেন, পুর-কর্তৃপক্ষ বিশেষ সুবিধা দেবে। কি সেই সুবিধার চেহারা?

পুরপ্রধান বাপ্পাদিত্য চট্টোপাধ্যায় বলেন, “বন্ধ কল-কারখানার ক্ষেত্রে পুর-কর্তৃপক্ষের অনেক টাকা বকেয়া থাকে। সেখানে শিল্প করতে চাইলে ওই বকেয়ার ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে। পরিকাঠামোগত সহায়তাও দেওয়া হবে।” তিনি বলেন, “শিল্পের পুনরুজ্জীবনের জন্য আমরা সব রকমের সাহায্য করতে তৈরি। কিন্তু শিল্পের জমিতে আমরা কোনও অবস্থাতেই প্রোমোটারি করতে দেব না।” নয়ের দশকে বন্ধ হয়ে যাওয়া ডাইং (কাপড় রং করা) কারখানার ম্যানেজার বাদলবাবু বলেন, “বন্ধ কারখানার জমিতে শিল্প করতে হলে কোন্নগরেই প্রচুর জায়গা মিলবে। দু’-একটা ভাল শিল্প এলেই এলাকার চেহারা ফের বদলে যাবে।” একই সুর কোন্নগরের গোটা শ্রমিক মহল্লায়। কেননা, তাঁরা জানেন নতুন শিল্প হলে তার সঙ্গে নাগরিক জীবনেরও আমূল পরিবর্তন ঘটবে।

 

(চলবে)