ইতিহাসপ্রেমী, বেড়ানোর নেশা রয়েছে এমন মানুষের সঙ্গে এ শহরের সখ্যতা দীর্ঘদিনের। ষোড়শ শতকের চোখ জুড়ানো এখানকার টেরাকোটার প্রাচীন মন্দির বারেবারেই টেনে এনেছে ইতিহাসবিদ ও ভ্রমণবিলাসীদের। শুধু টেরাকোটার মন্দিরই নয়, ইতিউতি ছড়িয়ে থাকা আরও কিছু প্রাচীন মন্দির সর্বোপরি ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা উৎসব ও গঙ্গা তীরবর্তী হওয়ায় প্রাকৃতিক দৃশ্যও এই শহরের আকর্ষণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে এইসব ঐতিহ্য নিয়ে নানা আলোচনা হলেও এখন সংগঠিত দাবি উঠছে গুপ্তিপাড়াকে সরকারিভাবে পর্যটন কেন্দ্রের মর্যাদা দেওয়ার। বস্তুত, গঙ্গাপারের এই প্রাচীন জনপদ তার মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে আর পাঁচটা শহরের চেয়ে আলাদা। শুধু ইতিহাস প্রসিদ্ধ মন্দির নয়, পলাশীর যুদ্ধে সিরাজদৌল্লার অন্যতম বীর সেনাপতি মোহনলালের মতো ঐতিহাসিক চরিত্রের আবাস ছিল এই শহরেই। মোহনলালের সেই স্মৃতি আজও গর্ব এ শহরের। কে ভুলতে পারবে, বাংলার প্রথম বারোয়ারির উৎপত্তি হয়েছিল এ শহরেই। বাঙালির সংস্কৃতিতে বারোয়ারি পুজো বলে যে কিছু হতে পারে তা প্রথম জানিয়েছিল গঙ্গাপারের এ শহর।

গুপ্তিপাড়ার বৃন্দাবনচন্দ্র জিউ মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে বেশ কয়েক বছর আগে কেন্দ্রীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছে। সম্প্রতি এই মন্দিরের সংস্কারও হয়েছে। মূল মন্দিরকে কেন্দ্র করেই জগন্নাথ, রাম-সীতা, কৃষ্ণচন্দ্র এবং গৌর নিতাইয়ের মন্দির রয়েছে। এছাড়াও আছে দেশকালী আর সুলেমন সাধুর মতো প্রাচীন মন্দির। বলতে গেলে গোটা শহরে প্রাচীন মন্দিরের যে নমুনা ছড়িয়ে আছে, তাতে  এ শহরকে মন্দির-শহর বললেও অত্যুক্তি হবে না।

গুপ্তিপাড়ার বিখ্যাত রথ।

তবে ইতিহাসে সমৃদ্ধ হলেও পরিকাঠামোর উন্নয়নের ক্ষেত্রে বহু যোজন পিছিয়ে গুপ্তিপাড়া। কলকাতা থেকে কিছু দূরে এই শহরের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল নয়। শুধু কলকাতা কেন, জেলা সদর চুঁচুড়ার সঙ্গেও এই শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত নয়। হাওড়া-ব্যান্ডেল হয়ে কাটোয়া শাখার স্টেশন গুপ্তিপাড়া রেল মানচিত্রে ঢুকে গেলেও এখনও সিঙ্গল লাইন হওয়ায় গুটি কয়েক ট্রেন চলে এই শাখায়। ফলে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলেও তা এ শহরের মানুষকে স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারেনি। রাস্তাঘাট, বিদ্যুতের ব্যবস্থা থেকে নিকাশি, স্বাস্থ্য কোনও ক্ষেত্রেই সু-ব্যবস্থার ধারে কাছে পৌঁছয়নি এ শহর। দীর্ঘদিন ধরে শহরের এ হেন পরিচিত চেহারাটা এ বার পাল্টাক, চাইছেন শহরবাসী। পর্যটন কেন্দ্রের দাবিকে সামনে রেখেই  উন্নতি ঘটুক শহরের এটাও চাইছেন তাঁরা। এর জন্য একটি কমিটিও তৈরি করেছেন তাঁরা। কমিটির তরফেই কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য পর্যটন কেন্দ্রের কাছে নিজেদের দাবি পৌঁছে দিয়েছেন তাঁরা। কমিটির সম্পাদক বিশ্বজিৎ নাগ বলেন, ‘‘গত বছর আমরা গুপ্তিপাড়াকে পর্যটন কেন্দ্রের মর্যাদা দেওয়ার দাবি তুলেছিলাম। এখন কিছুটা হলেও আমরা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। কেন না, আমাদের দাবিকে সম্মান জানিয়ে রাজ্যের সংশ্লিষ্ট দফতর একটি বেসরকারি সংস্থাকে দিয়ে সমীক্ষা করিয়েছে। সেই রিপোর্টের ফল শীঘ্রই জানতে পারব বলে আশা করছি।’’ তিনি আরও জানান, সম্প্রতি পূর্ব রেল কর্তৃপক্ষ তাঁদের দাবিকে মান্যতা দিয়ে এক চিঠিতে জানিয়েছেন, গুপ্তিপাড়ার ইতিহাস বিবেচনা করে গুপ্তিপাড়া ও লাগোয়া কয়েকটি স্টেশনে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হবে।

তবে একটি এলাকাকে পুরোদস্তুর পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গ়ড়ে তোলার প্রধান শর্ত হল উন্নত পরিকাঠামো। পরিবহণ থেকে হোটেল ব্যবস্থা, রাস্তা, আলো সব কিছুরই উন্নতির প্রয়োজন। নজর রাখতে হবে শহরে বেড়াতে আসা মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যের দিকেও। শহরে নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত সুব্রত মণ্ডলও তা স্বীকার করেন। তাঁর কথায়, ‘‘এখানে গঙ্গার বুকে জেগে ওঠা চোখ জুড়ানো সবুজ দীপ আছে। রয়েছে ঐতিহাসিক রথযাত্রা উৎসব। তাই সার্বিকভাবে গুপ্তিপাড়াকে পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে হলে পরিকাঠামোর সঙ্গেই সবুজ দীপ বা অন্যান্য জায়গায় যাতায়াতের ব্যবস্থা ভাল করা জরুরি।’’

(চলবে)