প্রসূন জিতলেও ব্যবধান কমায় ক্ষোভ তৃণমূলে
হাওড়া সদর কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় তৃতীয় বারের জন্য সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু জয়ের ব্যবধান অনেক কমে গিয়েছে।
TMC

উচ্ছ্বাস: শিবপুরে তৃণমূল সমর্থকেরা। বৃহস্পতিবার। ছবি: দীপঙ্কর মজুমদার

তখন বিকেল চারটে। গণনা শেষ হতে ঢের দেরি। দেশ জুড়ে তত ক্ষণে মোদী-ঝড় উঠলেও হাওড়া সদর লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী তৃণমূল প্রার্থীর থেকে পিছিয়ে প্রায় ৬৫ হাজার ভোটে।

এরই মধ্যে এক দিকে হাওড়া ব্রিজের সামনের রাস্তাটা ভরে উঠল গেরুয়া আবিরে। আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠল বাজির শব্দ আর কয়েকশো বিজেপি সমর্থকের উল্লাসে। অন্য দিকে, শহরের উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তে দুই গণনা কেন্দ্রের সামনে বেজে উঠল তাসা, ব্যাঞ্জো। সবুজ আবির গায়ে মেখে, আকাশে উড়িয়ে বাজনার তালে তালে নাচলেন তৃণমূল সমর্থকেরা। শহরের দুই প্রান্তে যুযুধান দু’পক্ষের এই উল্লাস কার্যত জয়-পরাজয়ের ব্যবধানকে যেন মুহূর্তের মধ্যে উড়িয়ে দিল।

হাওড়া সদর কেন্দ্রে এ বার গণনা হয়েছে বেলুড়ের রামকৃষ্ণ শিক্ষণ মন্দির ও শিবপুরের আইআইইএসটি-র ভিতরে আইটিআই-এর তিনতলা বাড়িতে। বেলুড়ে গোনা হয়েছে হাওড়া সদরের সাতটি বিধানসভার মধ্যে বালি, উত্তর হাওড়া ও মধ্য হাওড়ার ভোট। আর আইটিআই-তে গোনা হয়েছে শিবপুর, দক্ষিণ হাওড়া, সাঁকরাইল ও পাঁচলা বিধানসভা এলাকার ভোট। হাওড়া সদর কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় তৃতীয় বারের জন্য সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু জয়ের ব্যবধান অনেক কমে গিয়েছে। গত নির্বাচনে প্রসূন যেখানে জিতেছিলেন প্রায় দু’লক্ষ ভোটে, এ বার সেখানে জয়ের ব্যবধান প্রায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। অন্য দিকে, বিজেপি প্রার্থী রন্তিদেব সেনগুপ্ত ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেশি ভোট পেয়েছেন। গত নির্বাচনে বিজেপি-র ঝুলিতে যেখানে ভোট পড়েছিল ২২ শতাংশ, এ বার তা বেড়ে হয়েছে ৪১ শতাংশ।

এ দিন ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে হাওড়ার দুই কেন্দ্রে গণনার কাজ শুরু হয়। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, গণনা কেন্দ্রের ১০০ মিটারের মধ্যে নির্বাচন কমিশন স্বীকৃত কোনও ব্যক্তি ছাড়া কেউ ঢুকতে পারেন না। সেই কারণে রাস্তার দু’দিকে বাঁশের ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছিল। দুই গণনা কেন্দ্রেই ওই ১০০ মিটারের বাইরে শিবির করে বসে ছিলেন তৃণমূল, বিজেপি ও কংগ্রেসের কর্মীরা। সিপিএম কর্মীদের কোনও শিবিরে দেখা যায়নি। তাদের কোনও নেতাও চোখে পড়েননি। 

এ দিন সকালের দিকে গণনা ঘিরে কোনও অশান্তি না হলেও গোলমাল বাধে বেলুড়ের রামকৃষ্ণ শিক্ষণ মন্দিরে বালি বিধানসভার গণনায়। সেখানে অর্পিতা গোস্বামী ও সঙ্গীতা সিংহ নামে বিজেপি-র কাউন্টিং এজেন্ট দুই মহিলাকে বেধড়ক মারধর করার অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের এক মহিলা এজেন্টের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, মারের চোটে অর্পিতা গুরুতর আহত হন। খবর পেয়ে ছুটে আসেন প্রার্থী-সহ বিজেপি-র দলীয় নেতৃত্ব। তাঁরা মুখ্য পর্যবেক্ষকের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। কিছু ক্ষণের জন্য গণনা বন্ধ থাকে। পরে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও রাজ্য পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। হাসপাতালে পাঠানো হয় জখম ওই মহিলাকে।

এ দিকে, প্রসূনবাবু ভোট কম পাওয়ায় শিবপুর ও বেলুড়ে তৃণমূলকর্মীদের মধ্যে হাতাহাতি বেধে যায়। পরে অবশ্য নেতাদের হস্তক্ষেপে সমস্যা মেটে। যদিও বালি, উত্তর হাওড়া ও মধ্য হাওড়া থেকে তৃণমূল বেশি ভোট না পাওয়ায় দলের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সব থেকে খারাপ ফল হয়েছে বালিতে। বালির ১৬টি ওয়ার্ডের মধ্যে সাতটিতেই হেরেছে তৃণমূল। অন্য দিকে, মধ্য হাওড়াতেও ফল আশানুরূপ হয়নি বলে তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি। এর কারণ হিসেবে বেলুড় গণনা কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে দলের কার্যকরী সভাপতি সৃষ্টিধর ঘোষের দাবি, ‘‘সিপিএম-সহ বিরোধী সমস্ত ভোট বিজেপিতে যাওয়ায় এমন ফল হয়েছে। দলের কর্মীদের ভুল থাকলে তা-ও সংশোধন করতে হবে।’’ জেলা সভাপতি অরূপ রায়ের বক্তব্য, ‘‘মানুষের মধ্যে নানা বিভ্রান্তির জন্য এমন ফল। তবে ভোট আমাদের কমেনি। শতকরা হিসেবে গত বারের মতোই হয়েছে।’’

নিজের পরাজয় স্বীকার করে নিলেও হাওড়ায় দলের ভোট বাড়ায় খুশি বিজেপি প্রার্থী রন্তিদেব। সারা দিন দুই গণনা কেন্দ্রে ছোটাছুটি করেছেন তিনি। রাতে বললেন, ‘‘প্রসূনবাবুকে শুভেচ্ছা জানাই। তবে হাওড়ায় বিজেপি-র ভোট বেড়েছে, এটাই ভাল খবর। আগামী দিনে এই কেন্দ্রে বিজেপি-র ভোট আরও বাড়বে বলেই মনে করি।’’ 

২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত