পুরসভার কেউ চন্দননগরের লক্ষ্মণ চৌধুরীকে চেনেন না। অথচ, ওই নামেই লেখা একটি হুঁশিয়ারি চিঠি’ প্রথম এসে পড়েছিল স্বপন কুণ্ডুর টেবিলে। 

মাসচারেক আগের কথা। স্বপনবাবু তখনও চন্দননগরের পুর কমিশনার হননি। তিনি তখন কল্যাণীর মহকুমাশাসক। বদলির নির্দেশ তখনও জারি হয়নি। তবে তিনি যে নতুন দায়িত্ব পেতে চলেছেন, জেনে গিয়েছিলেন স্বপনবাবু। একদিন নিজের অফিসে তাঁর নামে ওই চিঠি এল।

কিসের চিঠি?

খাম খোলার আগেই স্বপনবাবু তাজ্জব! উপরে লেখা, ‘চন্দননগরের পুর কমিশনার হিসেবে যোগ না-দেওয়ার জন্য সতর্কবার্তা’। প্রেরক— জনৈক লক্ষ্মণ চৌধুরী। যিনি নিজেকে স্বপনবাবুর ‘শুভানুধ্যায়ী’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। ইংরেজিতে লেখা সেই চিঠির ছত্রে ছত্রে ছিল ‘অ্যালার্ট কল’। একই সঙ্গে চন্দননগরের মেয়র রাম চক্রবর্তীকে দুর্নীতিপরায়ণ, অসৎ, চরিত্রহীন এবং প্রতারক বলে অভিযোগ করা হয়েছিল চিঠিতে। প্রেরক আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, স্বপনবাবু দায়িত্ব নিলে পর্দার আড়ালে মেয়রের সঙ্গে তাঁর ‘অর্থপূর্ণ বোঝাপড়া’ হবে। মেয়র নিজে স্বপনবাবুকে পুর-কমিশনার হিসেবে চেয়েছেন। এক মন্ত্রীর কাছে তাঁর নাম সুপারিশও করেছেন। সেইমতো স্বপনবাবু দায়িত্বে এলে ঠিকাদার এবং ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের বিপুল বকেয়া মেটাতে হবে। তাতে তিনি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়বেন।

চিঠিতে আরও জানানো হয়েছিল, তৃণমূলের ২৩ জন কাউন্সিলরের মধ্যে ২০ জনই মেয়র পদ থেকে রামবাবুকে সরানোর জন্য দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে নিজেদের বক্তব্য জানিয়েছেন। তার জন্য পদক্ষেপ শুরু হয়েছে।

কিন্তু রামবাবুকে সেই সময় পদ থেকে সরানো হয়নি। স্বপনবাবুকেও নতুন দায়িত্ব নেওয়া থেকে আটকানো যায়নি। কাজে যোগ দেওয়ার পর পরই ফের একটি বেনামি চিঠি পান স্বপনবাবু। তাতেও তাঁকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়েছিল। সঙ্গে পুরসভা ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি।

দু’টি চিঠির কথাই স্বপনবাবু প্রশাসনের উপর মহলে জানিয়েছিলেন। লক্ষ্মণ নামে তিনি কাউকে চিনতেন না বলেও দাবি করেছেন। কিন্তু কেন এত ‘পত্রবাণ’?

পুরসভার অলিন্দে কান পাতলে এর পিছনে এক আমলার কলকাঠি নাড়ার কথাও শোনা যাচ্ছে। যিনি এক সময়ে চন্দননগর পুরসভায় কাজ করেছেন। রামবাবু-বিরোধী গোষ্ঠীর নেতা, পুর-চেয়ারম্যান জয়ন্ত দাসেরও তিনি ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন। অভিযোগ, ওই আমলা যখন চন্দননগরে কাজ করছিলেন, তখন জয়ন্ত-অনুগামীদের পোয়াবারো ছিল। এখনও ওই আমলার সঙ্গে চন্দননগরের যোগাযোগ রয়েছে।

রামবাবু তো স্পষ্টই বলছেন, ‘‘ওই আমলার সঙ্গে যোগসাজশে জয়ন্তই নামে-বেনামে সব চিঠি দিয়েছেন। যাতে ওঁদের কায়েমি স্বার্থ অক্ষুণ্ণ থাকে। তাই আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ জানাতেও ওঁরা ছাড়েননি।’’ পক্ষান্তরে, জয়ন্তবাবু শেষ চিঠিটি লেখার কথা মানলেও আগের দু’টি তিনি লেখেননি বলে দাবি করেছেন। একই সঙ্গে অবশ্য স্বীকার করেছেন, ‘‘প্রাক্তন ওই আমলা খুবই যোগ্য ছিলেন।’’

রামবাবুর সঙ্গে জয়ন্তবাবুর বিরোধ ঠিক কী নিয়ে?

যথারীতি সামনে আসছে তৃণমূলের চিরাচরিত গোষ্ঠী-কোন্দল। ২০১৫ সালে চন্দননগর পুরসভার বোর্ড গঠন ইস্তক মেয়রের পদ নিয়ে তৃণমূলের কোন্দল বেআব্রু হয়ে পড়ে। রামবাবুকে মেয়র পদ থেকে সরিয়ে কাউন্সিলরদের একাংশ চেয়ারম্যান জয়ন্তবাবুকে মেয়র পদে বসানোর জন্য উঠেপড়ে লাগেন। কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ হয়নি। তৃণমূলের রাজ্য নেতৃত্ব তাতে কর্ণপাত করেননি। তৃণমূলের স্থানীয় নেতাদের একাংশ মনে করছেন, এই অবস্থায় একটা পথই খোলা ছিল। পুরসভাকে জনগণের কাছে অপদার্থ প্রমাণ করা। তাঁদের মতে, জয়ন্তপন্থী কাউন্সিলরদের ধারণা হয়, পুরসভা যদি কাজ না-করে, পরিষেবা না-দেয়, তা হলে বোর্ড বদল অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে।

সরকার বোর্ড বদলায়নি। ভেঙেই দিয়েছে। তৃণমূল নেতাদের একাংশ বলছেন, বিবাদ তো রাজনৈতিক মতাদর্শের নয়, ‘মধুভাণ্ড’-এর দখলদারি নিয়ে। কিন্তু কী সেই ‘মধুভাণ্ড’?