পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি নির্বাচনে পরাজিত হল বেচারাম মান্নার গোষ্ঠী। মঙ্গলবার ছিল সিঙ্গুর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি নির্বাচন। সেখানেও ভোটাভুটি এড়ানো যায়নি। এর আগে পঞ্চায়েত বোর্ড গঠনে অন্তর্ঘাতের অভিযোগ তুলেছিলেন সিঙ্গুরের মাস্টারমশাই রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। সমিতির সভাপতি নির্বাচনে সেই মাস্টারমশাই গোষ্ঠীর কাছে পরাজিত হলেন বেচাবাবুরা।
পান্ডুয়ায় অবশ্য দলীয় কোন্দল থাকলেও ভোট এড়ানো গিয়েছে। সিঙ্গুরের নতুন সভাপতি হলেন তপন মালিক। পান্ডুয়ার সভাপতি হয়েছেন চম্পা হাঁসদা। এ দিন দুই জায়গায়ই পুলিশ, প্রশাসনের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। 
হরিপালের বিধায়ক বেচারাম মান্না এবং সিঙ্গুরের বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের গোষ্ঠীর আকচাআকচি নিয়ে জেরবার রাজ্য নেতৃত্ব। পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের জায়গায় এখন হুগলির পর্যবেক্ষক ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। কিন্তু তাতেও গোষ্ঠী বিবাদে ছেদ পড়েনি। উল্টে বেড়েছে। দলেরই অনেক নেতা মনে করছেন, জেলা সভাপতি তপন দাশগুপ্তর রাশও দলে প্রতিদিন আলগা হচ্ছে। ফলে জেলার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে এখন সিঙ্গুরের নির্বাচিত পঞ্চায়েত সদস্যরা বিচার চাইতে হাজির হচ্ছেন কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে।

পান্ডুয়ায় তৃণমূলের বিজয়-মিছিলে আটকে পড়ল অ্যাম্বুল্যান্স (ডান দিকে)। সুশান্ত সরকার

পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে সোমবার রাতেই ঘুঁটি সাজিয়েছিলেন সিঙ্গুরের যুব সভাপতি মহাদেব ঘোষ। তিনি সিঙ্গুরের বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ভটাচার্য ঘনিষ্ঠ। দলের অন্দরের খবর, পঞ্চায়েত বোর্ড গঠনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ওই রাতেই দলের ২৮ জন সমিতি সদস্যকে একটি লজে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ছিল কব্জি ডুবিয়ে খাওয়ার আয়োজন— শর্ত একটাই, কেউ মোবাইল ব্যবহার করতে পারবেন না বোর্ড গঠন না-হওয়া পর্যন্ত।
পুরো আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন মাস্টারমশাইয়ের ছেলে তুষার ভট্টাচার্য। পুলিশ, প্রশাসনও তটস্থ ছিল ওই আয়োজন ঘিরে। দুর্গাপুর থেকে রিজার্ভ ব্যাটেলিয়ানের ফোর্স আনা হয়। ছিল র‌্যাফ, কমব্যাট ফোর্সও। প্রশাসন সূত্রের খবর, মোট ৪৭ আসনের সিঙ্গুর পঞ্চায়েত সমিতির আসনে সরাসরি ভোটাভুটি হয়। তবে ক্রস ভোটিং আটকাতে পারেননি মাস্টারমশাই। তাতে অবশ্য তাঁর ভোট কমেনি। 

বিজয়মিছিলে রবীন্দ্রনাথবাবুও। নিজস্ব চিত্র

সভাপতি নির্বাচনে বেচারামবাবুর গোষ্ঠী পায় ২১টি এবং অন্য গোষ্ঠী পায় মোট ২৬টি আসন। মাস্টার মশাইয়ের গোষ্ঠীর দুই সদস্য ক্রস ভোটিং করেন। কিন্তু সহ-সভাপতি নির্বাচনের সময় দেখা যায় ওই গোষ্ঠীরই দু’টি ভোট বাড়ে। অর্থাৎ ১৯-২৮টি ভোট পেয়ে গতবারের সভাপতি প্রতিমা দাস এ বার সহ-সভাপতি পদে জিতে যান। সিঙ্গুরের বিডিও প্রবণ মণ্ডল বলেন,‘‘পুরো প্রক্রিয়াই সুষ্ঠভাবে হয়েছে।’’
বেচারাম গোষ্ঠীর তরফে পঞ্চায়েত সমিতির প্রস্তাবিত সভাপতি ছিলেন দুধকুমার ধাড়া। তিনি হেরে দলের নেতাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন। বলেন, ‘‘দলের নেতারা ধৃতরাষ্ট্রের ভূমিকা পালন করেছে। সিঙ্গুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এই সমিতি গঠনে আমাদের সঙ্গে কেউ কথাই বলেননি। একতরফা সব হয়েছে।’’ অন্য এক জয়ী সদস্য হারাধন ঘোষ বলেন, ‘‘আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলাম, সিঙ্গুরের জমি চাষযোগ্য করে চাষিকে ফিরিয়ে দেব। তা হয়নি। প্রয়োজনে ফের আমরা রাস্তায় নামব।’’ 
এর পাল্টা রবীন্দ্রনাথবাবু বলেন, ‘‘দলে একটা দ্বন্দ্বের ছায়া সবকিছু গ্রাস করতে চেয়েছিল। সেই ছায়া সরে গিয়েছে।’’ বেচারামবাবু অবশ্য মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, ‘‘সংবাদমাধ্যম নয়, যা বলার দলকে বলব।’’
এ দিকে সিঙ্গুরের মতোই গোষ্ঠী বিবাদ ছিল পাণ্ডুয়াতেও। গতবারের সহ-সভাপতি অসিত চট্টোপাধ্যায়কে সরাতে এ বার মরিয়া ছিলেন জেলা সভাপতি ঘনিষ্ঠ সঞ্জয় ঘোষ। পরিস্থিতি এমনই যে, অসিতবাবু এ দিন বিডিও অফিসেই আসেননি। তার ফলে সহজ হয়ে যায় সমীকরণ। পাণ্ডুয়ায় দলের ব্লক সভাপতি অনিসুল ইসলামও এ বার প্রত্যাশী ছিলেন সভাপতি পদে। শেষ পর্যন্ত চম্পাদেবী সভাপতি এবং সঞ্জয়বাবুকে সহ-সভাপতি মনোনীত করে দল।কিন্তু এই কোন্দল নিয়ে উন্নয়ন কতটা সম্ভব— প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে সেটাই। সিপিএমের জেলা সম্পাদক দেবব্রত ঘোষ বলেন, ‘‘কোথাও কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই, না প্রশাসনে না তৃণমূলের ভিতরে। গোটা রাজ্যে ছড়িয়ে তার নজির। এর বেশি আর কী হবে?’’