মাত্র দু’বছরেই সব নজরদারি-বিধি নিষেধ লোপাট! 

‘সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ’- এর প্রচারে মুড়ে ফেলা হয়েছিল হাওড়া গ্রামীণ জেলার বিভিন্ন এলাকা। হেলমেট ছাড়া মোটরবাইক চালালে পুলিশের ধরপাকড় শুরু হয়েছিল। এই পরিকল্পনারই অঙ্গ হিসাবে পেট্রোল পাম্পগুলিতেও পুলিশের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, হেলমেট না থাকলে পেট্রোল দেওয়া হবে না বাইকআরোহীকে। কিন্তু সেই ছবি বদলে গিয়েছে বেমালুম। 

উলুবেড়িয়ায় মুম্বই রোডের ধারে একাধিক পাম্পে দেখা গেল, হেলমেট ছাড়াই পেট্রল নিতে আসছেন বাইকআরোহীরা। পাম্পেই রাখা রয়েছে হেলমেট। সেটি ওই চালকের মাথায় পরিয়ে পাম্প-এর কর্মী পেট্রল দিচ্ছেন। এমনকী পুলিশের দেওয়া ‘সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ’ সংক্রান্ত ফ্লেক্সগুলিও উধাও। শ্যামপুর-উলুবেড়িয়া রোডের ধারে পারিজাতের  একটি পেট্রোল পাম্পের ছবিটাও একই।

সাজাহান মিদ্দা নামে এক যুবক পেট্রল নিচ্ছিলেন পারিজাতের পাম্প থেকে। হেলমেট ছিল না। তিনি বললেন, ‘‘কাছেই বাড়ি, এইটুকু আসার জন্য আর হেলমেট কী নেব?’’ পাম্প মালিকদের বক্তব্য, যাঁরা হেলমেট পরে আসেন না তাঁদের দাবি, তাঁরা স্থানীয় বাসিন্দা। তাড়াহুড়োয় হেলমেট পরার সময় পাননি।  

পাম্প মালিকদের দাবি, হেলমেট না পরলে অনেক সময় পেট্রেল না দেওয়ার কথা বলা হয়। তার ফল হয় উল্টো। বহুবার এই কারণে বাইকচালকদের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছেন পাম্পের কর্মীরা। এক পাম্প মালিকের কথায়, ‘‘কে ঝামেলায় জড়াতে চায় বলুন!’’

শুধু তাই নয়। সোমবার কুলগাছিয়ায় অভিযেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভায় বাইক চেপে যে তৃণমূল কর্মীরা হাজির হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই হেলমেট পরে ছিলেন না। পুলিশ একেবারেই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। পুলিশের এক আধিকারিক বলেন, ‘‘ মুখ্যমন্ত্রী সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফের কথা বলছেন। তা নিয়ে জোরদার প্রচারও চলছে। কিন্তু তার ফল তো শাসকদলের কর্মীদের দেখেই বোঝা যাচ্ছে!’’ 

হাওড়া গ্রামীণ জেলা পুলিশ সুপার গৌরব শর্মা বলেন,  ‘‘হেলমেটহীন বাইক চালক ও আরোহীদের ধরতে অভিযান চলে। ফের পেট্রল পাম্পগুলিতে নজরদারি ফের বাড়ানো হবে।’’

একই ছবি হুগলিতেও। 

দিন কয়েক আগে উত্তরপাড়া থেকে মোটরবাইকে চড়িয়ে মা-কে ডানকুনি নিয়ে যাচ্ছিলেন বছর কুড়ির যুবক সোনা। তিনি হেলমেট পরলেও মা পরতে চাননি। ভোরের দিকে ফাঁকা রাস্তায় বাইকের গতি একটু বেশিই ছিল। ডানকুনির হাউজিং মোড়ের কাছে উল্টো দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের ধাক্কায় মারা যান ওই মহিলা। 

জেলায় বাইক দুর্ঘটনা নিত্যদিনের ঘটনা। বালিবোঝাই লরির ধাক্কায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যাতেই মৃত্যু হয় দুই মোটরবাইক আরোহীর। গোঘাটের চণ্ডীপুরের এই দুর্ঘটনায় মৃতের দীপঙ্কর সাঁতরা (২০) এবং শুভেন্দু সাঁতরা(২১)। দুজনেই স্থানীয় শালিঞ্চা গ্রামের বাসিন্দা। ওই দুই যুবক বাইক চেপে আরামবাগে ফিরছিলেন। কেউই হেলমেট পরে ছিলেন না। 

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, হেলমেট না পরার কারণেই দুর্ঘটনা ঘটছে। হেলমেট পরার বিষয়ে পুলিশের নজরদারি কমেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। 

হুগলির বিভিন্ন পেট্রল পাম্পেও ঘুরে দেখা গেল, হেলমেট না পরলেও পেট্রল পেতে কোনও সমস্যা হচ্ছে না। শ্রীরামপুরের এক পাম্পে ছোট মেয়েকে নিয়ে পেট্রল নিতে এসেছিলেন প্রতীক কুমার। তিনি নিজেও হেলমেট পরেননি। খুদেটাকেও পরাননি। কেন? তাঁর সটান জবাব, ‘‘মেয়ের স্কুলে দেরি হয়ে যাচ্ছিল। তাই আর পরা হল না।’’ আর খুদের উত্তর, ‘‘হেলমেট পরলে মাথা চুলকোয়।’’

ডানকুনিতে অহল্যাবাই রোডে হেলমেট বিক্রির দোকান রয়েছে প্রশান্ত ঘোষের। তিনি বলেন,‘‘মাঝে পুলিশের ধরপাকড়ের সময় বিক্রি বাড়ে হেলমেটের। এখন হেলমেট বিক্রি অনেক কমে গিয়েছে।’’

পেট্রল পাম্প মালিকদের দাবি, পুলিশের নজরদারি কমতেই হেলমেট না পরেই অনেকে আসছেন। এমনকী পেট্রল না দিতে চাইলে পাম্পে ভাঙচুরের ঘটনাও জানিয়েছেন তাঁরা।

হুগলি জেলা (গ্রামীণ) ও চন্দননগর কমিশনারেটের কর্তারা অবশ্য অভিযোগ মানতে নারাজ। পুলিশ কমিশনার অজয় কুমার বলেন ‘‘ সব কর্মসূচি নিয়মমাফিক চলছে।’’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্তার পাল্টা যুক্তি, ‘‘জোর করে এভাবে কত মানুষকে হেলমেট পরানো যায়? মানুষ যদি সচেতন না হয়, কারও কিছু করার নেই।’’