নিজেই নিজের বিয়ে রুখে উচ্চ মাধ্যমিকে ৪৫০! মার্কশিট হাতে নিয়ে অঝোরে কাঁদছিল কামরুন্নেসা। সেই কান্না যুদ্ধ-জয়ের আনন্দে। স্বপ্ন পূরণের পথে আর এক ধাপ এগোতে পেরে।    

মা-মরা তরুণীকে লড়াই করতে হচ্ছে সেই আট বছর বয়স থেকে। দাদু-দিদিমার অভাবের সংসারে জরির কাজ করে তাকে অর্থ জোগাতে হয়। তার মধ্যেই চালিয়ে যাচ্ছিল পড়াশোনা। শিক্ষিকা হওয়ার স্বপ্ন তার দু’চোখে। কিন্তু সেই স্বপ্নে ছেদ পড়তে চলেছিল দু’বছর আগে। দাদু-দিদিমা তার বিয়ের আয়োজন পাকা করে ফেলেছিলেন। কিন্তু কামরুন্নেসা পড়তে চেয়েছিল। তাই বন্ধু, স্কুলের শিক্ষক এবং প্রশাসনের সাহায্য নিয়ে নিজের বিয়ে নিজেই রুখে দেয়। সোমবার মিলল খুশির খবর। সব বিষয়ে ‘লেটার’ নিয়ে ৯০% নম্বর পেয়ে উলুবেড়িয়ার বাণীবন কল্যাণব্রত সঙ্ঘ হাইস্কুলের ছাত্রী কামরুন্নেসা খাতুন শুধু উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণই হল না, দৃষ্টান্তও তৈরি করল।            

যে দাদু-দিদিমা দু’বছর আগে নাতনির বিয়ে দিতে যাচ্ছিলেন, সেই গোলাম হোসেন এবং আকলিমা বেগমই এখন বলছেন, ‘‘ভুল করতে যাচ্ছিলাম। এখন বুঝতে পারছি। ও পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াক। ও যখন বলবে, তখন বিয়ের কথা ভাবব। ও যে এত মেধাবী আমরা বুঝিনি।’’ পুলিশ পাঠিয়ে কামরুন্নেসার বিয়ে যিনি রুখে দিয়েছিলেন, সেই উলুবেড়িয়া-২ ব্লকের বিডিও নিশীথকুমার মাহাতোও বলেন, ‘‘কামরুন্নেসার খবর শুনে আনন্দ হচ্ছে। ওইটুকু মেয়ে নিজের বিয়ে রুখে যে ভাবে পড়াশোনা করেছে, এটা প্রশংসনীয়। আমি ওর পড়াশোনার বিষয়ে সাহায্যের জন্য পাশে থাকব।’’

২০১৭ সালে নিজের বিয়ে রোখার মুহূর্ত। নিজস্ব চিত্র

কামরুন্নেসারা তিন ভাইবোন। কামরুন্নেসার যখন আট বছর বয়স, তার মা মারা যান। কামরুন্নেসার বাবা আতামুল হক আবার বিয়ে করেন। কিন্তু সৎমায়ের অত্যাচার সহ্য করতে পারছিল না তিন ভাইবোন। বৃন্দাবনপুর থেকে দাদু-দিদিমা তাদের নিয়ে আসেন নিজেদের বাণীবনের বাড়িতে। কামরুন্নেসার দাদু ভ্যানরিকশা চালান। দিদিমা জরির কাজ করেন। কামরুন্নেসাও জরির কাজ করেই পড়াশোনা চালিয়ে যায়। মাধ্যমিকে সে ৮৩% নম্বর পেয়েছিল। অভাবের মধ্যে পড়াশোনা কতদূর চালাতে পারবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু কখনও ভাবেনি নাবালিকা অবস্থাতেই তার বিয়ের ব্যবস্থা করবেন দাদু-দিদিমা!

সেটাই হল ২০১৭ সালের অগস্টে। ১২ অগস্ট তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। দাদু-দিদিমা তার বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিয়ের দু’দিন আগে কোনও মতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে কামরুন্নেসা বন্ধুদের কাছে চলে যায়। বিয়েতে আপত্তি জানিয়ে কান্নাকাটি জুড়ে দেয়।। খবর পান স্কুলের শিক্ষকেরা। সেখান থেকে বিডিও এবং পুলিশ। দাদু-দিদিমার থেকে মুচলেকা নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের লোকজন নাবালিকা বিয়ে বন্ধ করেন ঠিকই, কিন্তু বাড়ি ফিরতে ভয় পাচ্ছিল কামরুন্নেসা। পুলিশ অভয় দিয়ে তাকে বাড়ি ফেরায়।

সোমবার স্কুলের প্রধান শিক্ষক তপনকুমার রায়ের হাত থেকে মার্কশিট নেওয়ার সময় বারবার গত বছরের কথা মনে পড়ছিল কামরুন্নেসার। শিক্ষকদের প্রণাম করে সে বলে, ‘‘আপনারাই আমার অভিভাবক। আপনারা না-থাকলে আমার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া হতো না।’’ প্রধান শিক্ষক প্রিয় ছাত্রীকে সান্ত্বনা দেন। স্কুল ছেড়ে দিলেও পড়াশোনার বিষয়ে সব সময় সাহায্যের আশ্বাস দেন।

কামরুন্নেসা বলে, ‘‘গত বছর বিয়ে বন্ধ হওয়ার পরেও বাড়িতে নানা অত্যাচার হতো। দিনে পড়তে দেওয়া হতো না। সংসারের নানা কাজ চাপিয়ে দেওয়া হতো। জরির কাজ করে সপ্তাহে ৭০০ টাকা রোজগার করতে হতো। ওই টাকা দাদু-দিদিমাকে না-দিলে খাবার জুটত না।’’

সোমবার নাতনির মার্কশিট দেখে অবশ্য দাদু-দিদিমার মুখে হাসি ফুটেছে। ইতিহাসে অনার্স নিয়ে পড়ার ইচ্ছা কামরুন্নেসার। কিন্তু কলেজে ভর্তির টাকা জোগাড় হবে কোথা থেকে সে উত্তর তার জানা নেই। ফের চোখ দিয়ে জল গড়ায় তার।