মুঘল আমল থেকেই অনেক বিদ্রোহের সাক্ষী থেকেছে ঐতিহাসিক শহর ক্ষীরপাই। বর্তমানে আড়ে-বহরে বেড়েছে চন্দ্রকোনা ব্লকের সদর শহর। ক্ষীরপাই পুরসভাও প্রায় একশো চল্লিশ বছরের পুরনো। শহরের বাসিন্দাদের দাবি, ক্ষীরপাইয়ের ঐতিহ্য সংরক্ষণে উদ্যোগী হোক প্রশাসন।

শহরের নামকরণ নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। জানা যায়, সংস্কৃতে ‘ক্ষীর’ শব্দের অর্থ অশ্বত্থ গাছ। তাই অনেকে মনে করেন এখানে দিগন্ত বিস্তৃত গোচারণভূমিতে সারি সারি অশ্বত্থ গাছ ছিল। তাই থেকেই শহরের ক্ষীরপাই নামকরণ হয়ে থাকতে পারে। ওড়িয়া ভাষায় ক্ষীরপাই শব্দের অর্থ গোচারণভূমি। জনশ্রুতি, ষোড়শ শতাব্দীতে শ্রী চৈতন্য  শ্রীক্ষেত্র যাওয়ার সময় বেশ কিছুটা সময় এই এলাকায় কাটিয়েছিলেন। তিনি ভক্তদের ক্ষীরও বিতরণ করেন বলে কথিত রয়েছে। তারপর থেকে এই জনদপটি ক্ষীরপাই নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

শহরেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শ্বশুরবাড়ি। পুরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের কাছারিবাজারে ইশ্বরচন্দ্রের স্ত্রী দীনময়ীদেবীর বাপের বাড়ির বংশধরেরা আজও রয়েছেন। ওই বংশেরই এক সদস্য গৌতম ভট্টাচার্যের দাবি, “দাদুদের মুখে শুনেছি বিদ্যাসাগর মহাশয় একাধিক বার এই শহরে এসেছিলেন।’’ ক্ষীরপাইয়ের ইতিহাস নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। জাড়া গ্রামের সাহিত্যিক রোহিণীনাথ মঙ্গল জানান, এক সময় ক্ষীরপাই শহরে তাঁত, রেশম-সহ একাধিক শিল্প গড়ে উঠেছিল। জনপদের প্রায় নব্বই শতাংশ বাসিন্দাই ওই সব শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্যবসা ঘিরে শহরের অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধিও ঘটে। তৈরি হয় একাধিক বাজার। শিববাজার, কাছারিবাজার, দয়ালবাজার, তিলিবাজার, নুনিয়াবাজাকে কেন্দ্র করে পত্তন হয় একাধিক গঞ্জের।

১৬৬০ সালে ফরাসি ও ইংরেজরা শহরের কাশীগঞ্জে বসবাস করতে শুরু করে। সেই সময় শহরের ফরাসিরা কাপড়ের বাজার তৈরি করেছিলেন ফরাসিডাঙায়। ডাচরা ফরাসিডাঙা থেকে কাপড়ও কিনতেন। প্রতিদিন ক্ষীরপাই থেকে কাপড় ওড়িশার কটক শহরের চাঁদনি চকে যেত। ক্ষীরপাইয়ে যখন বস্ত্র ব্যবসার রমরমা, তখনই ইংরেজদের দাপটে ফরাসিরা সব কারখানা তাদের হাতে তুলে দিয়ে দেশ ছাড়েন।

তৈরি হচ্ছে বাবরসা।

ফরাসিরা দেশ ছাড়ায় ক্রমে ফিকে হতে শুরু করে শহরের রেশম ও তাঁত শিল্পের ঐতিহ্য। বস্ত্র শিল্পের থেকে ইংরেজদের বেশি আগ্রহ ছিল নীল উৎপাদনে। ব্রিটিশদের শাসনকালে শহরে গড়ে ওঠে নীলকুঠি। কুঠিগুলির দেখভালের দায়িত্ব বর্তায় রেসিডেন্ট এডওয়ার্ড বাবরশ-এর উপর। ইংরেজদের থাকার জন্য শহরে তৈরি হয় বড় ব়ড় ইমারত। সংস্কারের অভাবে সেগুলির অধিকাংশই আজ জীর্ণ।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৭৪০-১৭৫০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময় বর্গিরা ক্ষীরপাই শহরে একাধিক বার আক্রমণ করে। বর্গিদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে এলাকা ছাড়তে শুরু করেন বাসিন্দারা। যদিও এডওয়ার্ড বাবরশ বর্গিদের হঠিয়ে দেন। শান্তি ফিরে আসে শহরে। এই ঘটনার পর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ স্থানীয় এক মিষ্টি ব্যবসায়ী ‘বাবরসা’ নামে একটি মিষ্টি তৈরি করে এডওয়ার্ডকে উপহার দেন। সেই থেকেই শহরের মানুষের পছন্দের মিষ্টির তালিকায় স্থান করে নিয়েছে বাবরসা। 

১৭৭৩ সালে ক্ষীরপাই শহরে আচমকাই সন্ন্যাসী-বিদ্রোহের ঢেউ আঁচড়ে পড়ে। বিদ্রোহ কড়া হাতে দমন করেন রেসিডেন্ট জনস্টন ক্যাপ্টেন হোয়াইট। পরবর্তীকালে ১৭৯৮-৯৯ সালে চুঁয়াড় বিদ্রোহের সূচনাও হয় এই জনপদেই। ১৮১৯ সালে ক্ষীরপাই বর্ধমান জেলা থেকে মেদিনীপুর জেলায় যুক্ত হয়। ক্ষীরপাইতে তৈরি হয় থানাও। এটিই বর্তমানে ক্ষীরপাই ফাঁড়ি। ১৮৪৫ সালে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য ক্ষীরপাই হুগলি জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। হুগলি জেলায় চুঁচুড়া, শ্রীরামপুর ও ক্ষীরপাই-তিনটি মহকুমা গড়ে উঠে। ১৮৭২ সালে ক্ষীরপাই মহকুমার নাম বদলে জাহানাবাদ (আরামবাগ) হয়। পরে ফের ক্ষীরপাই মেদিনীপুর জেলায় যুক্ত হয়। ঘাটাল ও চন্দ্রকোনা নিয়ে তৈরি হয় ঘাটাল মহকুমা।

শহরের বাসিন্দা আশিস অধিকারীর কথায়, ‘‘ক্ষীরপাইয়ে দীনময়ীদেবী ছাড়াও সুভাষচন্দ্র বসুর সহপাঠী অন্নদাপ্রসাদ চৌধুরীর জন্মভিটে। ১৯৪৬ সালে প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের মন্ত্রিসভায় অন্নদাপ্রসাদ চৌধুরী অর্থমন্ত্রীও হয়েছিলেন। সেই সময়ই তাঁর প্রচেষ্টায় গড়ে উঠে লোকসেবা সমিতি। গড়ে উঠে হালওয়াশিয়া মহকুমা গ্রন্থাগারও। সেই সময় লোকসেবা সমিতিতে সাবান, দেশলাই কাঠি, তেল, গোবর সার-সহ নানা ছোট শিল্প গড়ে ওঠে। তবে সবই আজ ধ্বংসের পথে।’’

বর্তমানে ক্ষীরপাই চন্দ্রকোনা ব্লকের সদর শহর। ১৮৭৪ সালে পুরসভা হিসাবে স্বীকৃতি পায় ক্ষীরপাই। যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকেও অনেক উন্নত হয়েছে শহর। বিডিও অফিস-সব ব্লক প্রশাসনের একাধিক অফিস গড়ে ওঠেছে শহরে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শহরের প্রাচীন ঐতিহ্যগুলি সংরক্ষণের ব্যবস্থা হোক। না হলে একদিন সবই শুধু স্মৃতি হয়ে যাবে।

— নিজস্ব চিত্র।