নিজস্ব ভবন নেই। নেই কর্মীও। সেই অবস্থাতেই ভোটের আগে তড়িঘড়ি দু’টি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের উদ্বোধন হল সোমবার। একই সঙ্গে, খড়্গপুর-২ ব্লকে ২৮৯টি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের কাজের সূচনাও হল এ দিন।

পশ্চিম মেদিনীপুরে একমাত্র খড়্গপুর-২ ব্লকে এতদিন কোনও অঙ্গনওয়াড়ি ছিল না। ফলে সুষম খাদ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল শিশু ও মায়েরা। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, জেলার ২২৫২ জন শিশু অপুষ্টির শিকার। যদিও কোনও অঙ্গনওয়াড়ি না থাকায় খড়্গপুর-২ ব্লকে অপুষ্টির চিত্রটা স্পষ্ট নয়। কেননা এই ব্লকে এতদিন কোনও সমীক্ষাই হয়নি। এক প্রশাসনিক আধিকারিকের কথায়, ‘‘ওই ব্লকে অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ৪০০ জনের মতো হবে বলে মনে করা হচ্ছে।’’ এ দিন দুপুরে মাগুরিয়া ও পুরুনিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দু’টি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী শশী পাঁজা। ছিলেন রাজ্যের আইসিডিএস ডিরেক্টর স্মিতা পাণ্ডে, অতিরিক্ত জেলাশাসক সুশান্ত চক্রবর্তী, মহকুমাশাসক সঞ্জয় ভট্টাচার্য, প্রকল্পের জেলা আধিকারিক অসিতবরণ মণ্ডল।  

মাগুরিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যখন অঙ্গনওয়াড়ির উদ্বোধন হচ্ছে, তখন অদূরে একটি পুকুরে বাবার সঙ্গে স্নান করছিল বছর তিনেকের বিজয় সিংহ। মাদপুরের বাসিন্দা বিজয়ের চেহারা শীর্ণকায়। দেহের অন্য অংশের তুলনায় পেট স্ফীত। দেখেই বোঝা যায়, সে অপুষ্টির শিকার। বিজয়ের বাবা সঞ্জয় সিংহ বলেন, “গ্রামে অঙ্গনওয়াড়ি নেই। আমি গাড়ি চালাই। কত আর আয়! ছেলেটাকে দু’বেলা পুষ্টিকর খাবার দেওয়া দূর, অনেক দিন খাবারই জোটে না।”

ভৈরবপুরের দেড় মাসের শিশুর মা ডালিয়া বিবি বলেন, “গর্ভবতী থাকাকালীন অঙ্গনওয়াড়ি না থাকায় কোনও পুষ্টিকর খাবার পাইনি। এখনও কোথায় পরিষেবা পাব তা-ও জানি না।” আর মাদপুর লকগেটের বাসিন্দা চার বছরের মৌমিতার বাবা রাজু সিংহ, তিন বছরের সুরজিতের মা চন্দনা সিংহদের ক্ষোভ, “আমাদের শিশুরা এত দিন পুষ্টিকর খাবার পায়নি। এখন ভোট আসতেই ঘটা করে অঙ্গনওয়াড়ির উদ্বোধন হচ্ছে।”

পুষ্টিবিধান ছাড়াও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিতে গর্ভবতী মা ও শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাও দেওয়া হয়। রাজ্যের অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের প্রকল্পগুলির ১০ শতাংশের দায়িত্ব স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলিকে দেওয়ার কথা। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্য সরকার ২০০৫- ’০৬ সালে খড়্গপুর-২ ব্লকের অনুমোদিত অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলি নিজেরাই পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ব্লকের শিউলিপুর উদয়ন সঙ্ঘ নামে এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আদালতে মামলা দায়ের করে। সম্প্রতি ওই মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। তারপরই ব্লকে ২৮৯টি অঙ্গনওয়াড়ি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এ দিন মন্ত্রী শশী পাঁজা বলেন, “২০০৫-’০৬ সালে অঙ্গনওয়াড়ির অনুমোদন হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। শিশু-মায়েরা বঞ্চিত হয়েছেন। পাপ করেছেন কিছু মানুষ।’’ তাঁর অভিযোগ, ‘বাম আমলে দিনের পর দিন খাতায়-কলমে দেখানো হয়েছে, ব্লকের অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলি চালু রয়েছে। ফলে টাকাও এসেছে। কিন্তু কোথায় এত টাকা গিয়েছে কেউ জানে না। আমরা ক্ষমতায় এসে টাকা নেওয়া বন্ধ করেছি।’’ মন্ত্রী বলেন, ‘‘জমি চিহ্নিত করে ২৮৯টি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের সূচনা করলাম। এটাই রাজ্যের ৫৭৬ তম এবং শেষ প্রকল্প।’’

বাস্তব চিত্রটা আসলে কী?

আপাতত ১২১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩টি মাদ্রাসা, ৭৭টি শিশু শিক্ষা কেন্দ্র, ৫৫টি ক্লাব-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ২৮৯টি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র চলবে। কারণ অধিকাংশ অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের জন্যই এখনও জমি মেলেনি। কয়েকটি ক্ষেত্রে জমি চিহ্নিতকরণের কাজ চলছে। কেন্দ্র পিছু ৬ লক্ষ ৮৯ হাজার টাকা ব্যয় হবে। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি কেন্দ্রে একজন কর্মী ও একজন সহায়িকা নিয়োগ করা হবে। কিন্তু এখনও সেই নিয়োগও হয়নি। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, মামলায় জয়ী শিউলিপুর উদয়ন সঙ্ঘই এই অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলি পরিচালনা করবে।

এ দিন মন্ত্রী বলেন, “আইনি জটিলতার মধ্যেও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিল। সেই প্রক্রিয়া চলছে। তবে যতক্ষণ না পর্যন্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হচ্ছে, ততদিন অন্য কেন্দ্র থেকে কর্মী ও সহায়িকা এনে ব্লকের কেন্দ্রগুলি চালানো হবে।” এ বিষয়ে জেলা পরিষদের সভাধিপতি উত্তরা সিংহ বলেন, “আপাতত আমরা খড়্গপুর-১, ডেবরা, পিংলা থেকে কর্মী ও সহায়িকা এনে প্রায় দু’শোর বেশি কেন্দ্র চালু করব।” কবে কোন কেন্দ্র খোলা হবে, এই প্রশ্নের উত্তরে শশী পাঁজা বলেন, “অন্য ব্লকের কর্মীরা সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই কেন্দ্রগুলিতে কাজ করবেন। আসলে ভোট চলে আসায় এখনই হয়তো নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা যাবে না। আগামী জুলাই মাসের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাবে বলে আশা করছি।”

মঞ্চে মন্ত্রী বলেন, “একটা অঙ্গনওয়াড়ি তখনই ভাল চলবে, যখন মা-বাবা, সমাজের মানুষ সচেতন হবে। এ ক্ষেত্রে কর্মী ও সহায়িকাদের দায়িত্ব রয়েছে। সামনে ভোট। আমরা জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ব। কিন্তু প্রশাসনিক আধিকারিকদের মানুষের জন্য এই কাজ চালিয়ে যেতে হবে।”