এ চিত্র সত্যি ব্যতিক্রমী!

লোকসভা ভোটের পরে দেশ জুড়ে গেরুয়া দাপট। পশ্চিমবঙ্গেও জেলায় জেলায় বাড়ছে বিজেপি। যে জেলায় কোনও লোকসভা আসন পদ্ম-প্রার্থীরা জেতেননি, সেই পূর্ব মেদিনীপুরেও লোকসভা ভোটে ভালই ভাগ বসিয়েছে বিজেপি।

ভোটের পরেও বসে নেই গেরুয়া শিবির। কাটমানি, সিন্ডিকেট, তোলাবাজি, চিটফান্ড, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব— একের পর বিষয়কে হাতিয়ার করে তৃণমূলের বিরুদ্ধে সুর চড়াচ্ছে তারা। পাশাপাশি নিজেদের দলীয় সংগঠনকে ঢেলে সাজছে বিজেপি। জেলার কাঁথি, রামনগরের মতো এলাকায় বিজেপির সংগঠন এখন বেশ জোরদার। ময়নার কয়েকটি অঞ্চলে তৃণমূলের সঙ্গে টক্কর দিচ্ছে বিজেপি। জেলার সদর শহর তমলুকেও বিজেপির প্রভাব বাড়ছে।

অথচ বন্দর ও শিল্পশহর হলদিয়ায় এখন অন্তত প্রকাশ্যে বিজেপির তেমন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। হলদিয়া মহকুমার অন্তর্গত যে নন্দীগ্রাম রাজ্য রাজনীতির পরিবর্তনের আঁতুড়ঘর, সেখানেও বিজেপি ততটা শক্তিশালী নয়। তারপরেও দেখা যাচ্ছে হলদিয়ায় সংগঠনের রদবদলে তেমন আগ্রহী নন বিজেপি নেতৃত্ব। সম্প্রতি পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথিতে অরূপ চক্রবর্তী এবং তমলুকে নবারুণ নায়েক বিজেপি-র জেলা সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু হলদিয়ায় তেমন কোনও রদবদল বা বিশেষ করে কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি। 

তবে কি হলদিয়া নিয়ে উদাসীন গেরুয়া শিবির?

বিজেপির হলদিয়া নগর-১ মণ্ডল সভাপতি দুর্গাপদ দাস বলছেন, ‘‘এলাকায় বিজেপির সংগঠন একেবারে নেই একথা ঠিক নয়। আসলে ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে আসতে পারছে না। তবে এটা ঠিক আমাদের দলের সব কর্মসূচিই হয় তমলুক ও কাঁথিতে। সে ক্ষেত্রে হলদিয়া উপেক্ষিত।’’

অথচ বামেদের শেষ সময় তৃণমূলের উত্থানের অন্যতম জমি ছিল এই হলদিয়া। এখন বিজেপিও বন্দরে সংগঠন তৈরি করছে। সম্প্রতি হলদিয়া বন্দরের কর্মী নির্বাচনে একটি আসনে গেরুয়া সংগঠন ভারতীয় মজদুর মোর্চা জিতেওছে। তবে সেই ভোটের অঙ্কই বলছে প্রকাশ্যে দেখা না গেলেও বিজেপির প্রতি সমর্থনের একটা চোরাস্রোত রয়েছে। কারণ বন্দরে গেরুয়া সংগঠনের  সদস্য সংখ্যা ৬৩। অথচ তারা ভোট পেয়েছে ৪১৫টি।

হলদিয়ার বিভিন্ন কল-কারখানাতেও বিরোধী স্বর আশ্রয় নিতে চাইছে গেরুয়া ছাতার তলায়। কিন্তু বিজেপি নেতৃত্বের অভিযোগ, সেখানে ভয়ের পরিবেশ এতটাই, যে কাজ হারানোর আতঙ্কে প্রকাশ্যে কেউ গেরুয়া সংগঠনে নাম লেখাতে পারছেন না। বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের কথায়, ‘‘হলদিয়ায় আমরা বেশ কয়েকটা অনুষ্ঠান করেছি। তবে সমস্যা হল ওখানে শুভেন্দু অধিকারী ভয়ঙ্কর অত্যাচার চালান। এই পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে কেউ বিরোধী সংগঠন করতে ভয় পান।’’ দিলীপের স্বীকারোক্তি, ‘‘ওখানে আমাদেরও ডাকাবুকো নেতার অভাব রয়েছে।’’ তবে হলদিয়ায় পোক্ত সংগঠন গড়তে তাঁরা আগ্রহী, তা-ও জানিয়েছেন বিজেপি-র
রাজ্য সভাপতি

এক সময় এই তল্লাটে যাদের একাধিপত্য ছিল সেই বামেরা অবশ্য বিজেপি-র সংগঠন তৈরি করতে না পারার অন্য ব্যাখ্যা দিচ্ছে। হলদিয়ার সিপিএম বিধায়ক তাপসী মণ্ডলের মতে, ‘‘একসময়ের শক্ত ঘাঁটি হলদিয়ায় এখনও বামেদের প্রভাব। বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে ‘গট-আপ গেম’ চলছে। তাই লোকসভায় তৃণমূল দেদার ছাপ্পা ভোট দিলেও বিজেপি প্রতিবাদ করেনি। ফলে, বিজেপির সংগঠন তৈরির প্রশ্নই ওঠে না।

হলদিয়াতে বিজেপির উত্থানের যাবতীয় সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে অন্য ব্যাখ্যা দিচ্ছেন তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠন আইএনটিটিইউসি-র জেলা কার্যকরী সভাপতি শিবনাথ সরকার বলেন, ‘‘খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ তৃণমূলের পক্ষে আছে। তাই দাঁত ফোটাতে পারছেনা বিজেপি।’’

২০২১-এর বিধানসভা ভোটের আগেও গিয়ে বিজেপি-র প্রকাশ্য সংগঠনের এমন দশাই থাকবে? প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে হলদিয়া জুড়ে।