বেকসুর খালাস হননি ছত্রধর মাহাতো। তবে হাইকোর্ট সাজা কমিয়েছে।
 
আদালতের রায় শুনে বুধবার কলকাতা থেকে ফোনে ছত্রধরের স্ত্রী নিয়তি বললেন, ‘‘আমার স্বামী মানুষের অধিকার নিয়ে বরাবর গণ আন্দোলন করে এসেছেন। সাজা কমলেও তিনি তো অপরাধীই থেকে গেলেন!’’
 
কাঁটাপাহাড়িতে পুলিশকে লক্ষ্য করে বিস্ফোরণের মামলায় ‘পুলিশি সন্ত্রাসবিরোধী জনসাধারণের কমিটি’-র নেতা ছত্রধর মাহাতো-সহ সাত জনকে ২০১৫ সালে যাবজ্জীবন কারাবাসের নির্দেশ দিয়েছিল মেদিনীপুর আদালত। এ দিন কলকাতা হাইকোর্ট ছত্রধর-সহ চারজনের যাবজ্জীবন কারাবাসের মেয়াদ কমিয়ে ১০ বছরের সাজা দিয়েছে। বেকসুর মুক্তি দিয়েছে রাজা সরখেল ও প্রসূন চট্টোপাধ্যায়কে। আগে মৃত্যু হয়েছে অন্যতম সাজাপ্রাপ্ত রঞ্জিত মুর্মুর। আদালতের এই রায়ে মোটেই খুশি নন তাঁর পরিবারের সদস্যেরা। নিয়তির দাবি, তাঁর স্বামী জঙ্গলমহলের অনুন্নয়ন আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন বলেই আজ জঙ্গলমহলে এত উন্নয়ন হয়েছে। আর ছত্রধরের বৃদ্ধা মা বেদনবালারও আক্ষেপ, ‘‘মানুষের কাজ করতে গিয়ে আমার বড় ছেলে ১০ বছর জেল খাটছে।’’
 
জঙ্গলমহলে গুঞ্জন, রাজনীতিতে ফিরছেন ছত্রধর। তবে কি শাসক দলের হয়েই ফের রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন ছত্রধর? এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে এ দিন নিয়তি বলেন, ‘‘এসব কথা বলার সময় এখনও আসেনি।’’ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাবেন? নিয়তির জবাব, রায়ের কপি দেখার পরে তাঁদের আইনজীবী এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। ২০০৮-২০০৯ আন্দোলন পর্বে ছ্ত্রধরের ছায়াসঙ্গী ছিলেন শ্যামল মাহাতো। শ্যামল এখন লালগড় ব্লক তৃণমূলের সভাপতি। বুধবার শ্যামল বলেন, ‘‘ছত্রদা বেকসুর খালাস পেলে বেশি খুশি হতাম। তবে সাজা কমায় কিছুদিনের মধ্যে তিনি মুক্তি পাবেন বলে আমরা আশাবাদী। উনি এসে তৃণমূলের সংগঠনিক দায়িত্ব নিলে আরও বেশি খুশি হব।’’
 
ঝাড়গ্রাম আদালতে ছত্রধরের সব মামলা লড়ছেন আইনজীবী কৌশিক সিংহ। হাইকোর্টের রায় শোনার পরে খুশি নন তিনিও। তাঁর কথায়, ‘‘গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ছত্রধর। সেই কারণে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একের পর এক মামলায় তিনি বেকসুর খালাস পাচ্ছেন। আশা ছিল, সাজাপ্রাপ্ত ইউএপিএ মামলায় তিনি বেকসুর খালাস পাবেন। এই রায় ছত্রধরের পক্ষে দুর্ভাগ্যজনক।’’ 
 
পুলিশি সন্ত্রাস বিরোধী জনসাধারণের কমিটির নেতা ছত্রধরের বাড়ি লালগড়ের আমলিয়া গ্রামে। ছত্রধরের মেজভাই শশধর মাহাতো ছিলেন মাওবাদীদের শীর্ষনেতা। ‘ফেরার’ শশধরের খোঁজে পুলিশের জেরা ও তল্লাশিতে জেরবার হয়ে পড়েছিলেন ছত্রধরের পরিবার। শশধর ২০১১ সালের ১০ মার্চ জামবনির চনসরো গ্রামে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। ২০০৩ সালে মাওবাদী সংক্রান্ত একটি মামলায় প্রথমবার গ্রেফতার হন ছত্রধর। কিছু দিন পরে জামিনও পেয়ে যান। এর পরই সিপিএম সমর্থক ছত্রধর তৃণমূলে নাম লেখান। ২০০৮-’০৯ সালে জঙ্গলমহল আন্দোলনের প্রধান মুখ ছিলেন ছত্রধর।তাঁকে সামনে রেখেই পুলিশি সন্ত্রাস বিরোধী জনসাধারণের কমিটির আন্দোলন শুরু হয়। 
 
২০০৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মহাষ্টমীর দুপুরে লালগড়ের বীরকাঁড়ে সাংবাদিকের ছদ্মবেশী পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যান ছত্রধর। ওই দিনই কাঁটাপাহাড়িতে পুলিশকে লক্ষ্য করে একটি বিস্ফোরণের মামলায় ইউএপি ধারায় ছত্রধরকে অভিযুক্ত করা হয়। ২০১৫ সালের ১১ মে মেদিনীপুরের চতুর্থ অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালতের বিচারক কাবেরী বসু ওই মামলায় ছত্রধর-সহ সাত অভিযুক্তকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দেন। এ ছাড়াও ছত্রধরের বিরুদ্ধে আরও ৩৮টি বিভিন্ন মামলা ছিল। এর মধ্যে ৬টিতে ছত্রধর বেকসুর খালাস পেয়েছেন। বাকি ৩১ টি মামলায় তাঁর জামিন মঞ্জুর হয়েছে। ঘাটশিলার একটি ফৌজদারি মামলায় এখনও জামিন পাননি ছত্রধর। 
 
ছত্রধর এখন প্রেসিডেন্সি জেলের বন্দি। চিকিৎসার জন্য বর্তমানে পুলিশি পাহারায় কলকাতার মুকুন্দপুরের একটি বাড়িতে প্যারোলে রয়েছেন। ছত্রধরের দুই ছেলের অস্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে। বড় ছেলে ধৃতিপ্রসাদ একটি সমবায় ব্যাঙ্কের লালগড় শাখায় বছর খানেক হল অস্থায়ী কর্মীর কাজ পেয়েছেন। ছোট ছেলে দেবীপ্রসাদ লালগড় প্রাথমিক চক্রের বিদ্যালয় পরিদর্শক দফতরে মাস খানেক হল অস্থায়ী কাজ পেয়েছেন।