• আনন্দ মণ্ডল
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ভাতের পাতে ছিল গয়নাবড়ি

pranab mukherjee
স্মৃতি: ১৯৯২ সালে তমলুকে প্রণব মুখোপাধ্যায় (চিহ্নিত)।

সাধারণ তক্তপোশে মাদুর পাতা। রাতে তাতেই ঘুমোতেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। প্রয়াত প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি। ওই তক্তপোশটি ছিল তমলুকে বাংলা কংগ্রেসের জেলা দফতরে। 

তমলুক শহরে প্রণববাবুর বহু স্মৃতি ছড়িয়ে। তমলুকের প্রবাদপ্রতিম বিপ্লবী তথা রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অজয়কুমার মুখোপাধ্যায় ও তাঁর সহযোগী সুশীলকুমার ধাড়ার হাত ধরে প্রণববাবুর তমলুকে আগমন। ১৯৬৮ সালে। অজয় ও সুশীলবাবু তখন বাংলা কংগ্রেসের দুই স্তম্ভ। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় থেকে অজয়বাবুর সঙ্গে প্রণববাবুর বাবা কামদাকিঙ্করের বন্ধুত্ব ছিল। অজয়বাবুর আগ্রহেই অধ্যাপনা করা প্রণববাবুর সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ। ১৯৬৬ সালে অজয় এবং সুশীলবাবুদের নেতৃত্বে বাংলা কংগ্রেস গঠিত হয়। তমলুক শহরে মহকুমা কংগ্রেসের অফিস হয়েছিল বাংলা কংগ্রেসের অন্যতম কেন্দ্র। বাংলা কংগ্রেসে যোগ দেওয়া যুবক প্রণব তখন ওই দলীয় কার্যালয়েই থাকতেন। প্রণববাবুর তমলুকবাসের কথা এখনও মনে করতে পারেন জয়দেব মালাকার। তাঁদের বাড়িতে যাতায়াত ছিল প্রণববাবুর। জয়দেববাবুর জেঠতুতো দাদা অজয় মালাকার ছিলেন তমলুক বিধানসভা কেন্দ্রের বাংলা কংগ্রেসের বিধায়ক। জয়দেববাবু বললেন, ‘‘শহরের মহকুমা কংগ্রেস কার্যালয় (বর্তমান জেলা কংগ্রেস কার্যালয়) হয়েছিল বাংলা কংগ্রেসের অন্যতম কার্যালয়। তমলুকের ওই অফিসে বসে দলের কাজ করতেন। রাতে ওই অফিসে ঘরেই থাকতেন। অফিসের ভিতরে থাকা তক্তপোশে বিছানা পেতে ঘুমোতেন। তাঁদের জন্য রাঁধুনি ছিলেন অফিসে।’’ মাঝেমাঝেই জয়দেববাবুর দাদা অজয় মালাকারের কাছে যেতেন। তাঁদের বাড়িতে টিফিনে মুড়ি ও নারকেল খেতে ভালবাসতেন। জয়দেববাবু বললেন, ‘‘উনি নিরামিষ খাবার পছন্দ করতেন। একবার আমাদের বাড়ি গয়নাবড়ি ভাজা, আলু-পোস্ত ভাজা, ডাল আর তরকারি দিয়ে ভাত খেয়েছিলেন।’’ 

জয়দেববাবুর স্মৃতিতে উজ্জ্বল ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত এবং চোখে পুরু লেন্সের চশমা পরা যুবক প্রণববাবুর সঙ্গে দলের নেতা অজয় মুখোপাধ্যায় ও সুশীল ধাড়াদের আলোচনায় মগ্ন থাকার দৃশ্য। আর কপালমোচনঘাটের কাছে ‘শ্রীগুরু প্রেসে’ আড্ডা দেওয়া। পাশের চায়ের দোকান থেকে চা আসত। প্রণববাবু তৃপ্ত চুমুক দিতেন। জয়দেব আরও বলেন, ‘‘বাংলা কংগ্রেসের নির্বাচনী কৌশল রচনায় প্রণববাবু গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতেন।’’ তিনি জানান, ১৯৭১ সালে বাংলা কংগ্রেস ও নব কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে সেতুবন্ধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন প্রণববাবু। কেন্দ্রের মন্ত্রী হওয়ার পরেও তমলুকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট ছিল। ১৯৯২ সালে কংগ্রেসের উদ্যোগে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবে তমলুকে এসেছিলেন। প্রদেশ কংগ্রেসের নেতা হিসেবেও তমলুকে আসেন। প্রণববাবু রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর সাংসদ শুভেন্দু অধিকারীর উদ্যোগে ২০১৩ সালে তমলুকের নিমতৌড়িতে স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে স্থাপিত বিপ্লবী সতীশ সামন্ত, অজয় মুখোপাধ্যায় ও সুশীল ধাড়ার পূর্ণাবয়ব মূর্তির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। 

রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ২০১৩ সালে ফের তমলুকে। সঙ্গে তৃণমূল নেতা শিশির এবং শুভেন্দু অধিকারী।  ফাইল চিত্র

তমলুকের বাসিন্দা কংগ্রেস নেতা সনৎ বটব্যাল বলেন, ‘‘১৯৬৭ সালের বাংলা কংগ্রেস গঠনের সময় শিক্ষিত তরুণদের রাজনীতিতে আনতে উদ্যোগী হয়েছিলেন সতীশবাবুরা। তখনই প্রণববাবুর রাজনীতিতে আসা।’’ মহিষাদলের ঐতিহাসিক হরিপদ মাইতি বলেন, ‘‘১৯৬৭ সালে দেশপ্রিয় পার্কে একটি সভায় বক্তৃতা করেন প্রণববাবু। নজরে আসে সুশীলবাবুদের। সতীশ সামন্তের জীবনী ‘সর্বাধিনায়ক’ উদ্বোধনের সময় প্রণববাবু উদ্যোগী হন। তাঁর সভাপতিত্বে ১৯৮২ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধী বইটি উদ্বোধন করেন। ২০১১ সালে মারা যান সুশীলবাবু। ছুটে এসেছিলেন প্রণববাবু। বিমর্ষ ছিলেন।’’ মহিষাদলের বাসিন্দা জনার্দন মাইতি বলেন, ‘‘প্রণববাবু একাধিকবার মহিষাদল এসেছেন। কাছ থেকে দেখেছি।’’ স্মৃতিচারণ করলেন মুগবেড়িয়ার চৈতন্যময় নন্দও। তিনি বললেন, ‘‘আমাদের পরিবারের সঙ্গে প্রণববাবুর গভীর সম্পর্ক ছিল। আমার বাবা জ্যোতির্ময় নন্দকে নির্বাচনে বাংলা কংগ্রেসের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে অনুরোধ করেছিলেন প্রণববাবু ও সুশীল ধাড়া। ১৯৬৬ সালে বাড়িতে আসেন তাঁরা। যদিও বাবা ভোটে দাঁড়াননি।’’ 

(সহ প্রতিবেদন: আরিফ ইকবাল খান)

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন