• নিজস্ব সংবাদদাতা
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

দলের বাধায় অধরা রইল নন্দীগ্রাম, মুকুল বললেন, ইতিহাস ফিরে আসে

1-1
ভাঙাবেড়ায় তিনি গাড়িতে আটকে। ছবি: পার্থপ্রতিম দাস।

Advertisement

দলের থেকে একলা হয়ে নন্দীগ্রাম যেতে চেয়েছিলেন তিনি। পদে পদে অবরোধ করে তাঁকে ফিরে যেতে বাধ্য করল দলই। গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে আসার পথে তৃণমূলে ব্রাত্য মুকুল রায় বললেন, “২০০৭ সালের ১৪ মার্চ সিপিএম আমাকে নন্দীগ্রামে ঢুকতে বাধা দিয়েছিল। সিপিএম নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়!”

এ রাজ্যে ‘পরিবর্তনের’ ইতিহাসে সিঙ্গুরের মতো নন্দীগ্রামও অন্যতম দিকচিহ্ন। অনেকের মতে, সেখানে জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আন্দোলন এবং নন্দীগ্রামকে ‘দখলমুক্ত’ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিচালনার ঘটনা থেকেই বামফ্রন্ট সরকারের পতনের সূত্রপাত। ২০০৭ সালের গুলিচালনার ঘটনার স্মরণে প্রতি বছর ১৪ মার্চ-কে ‘নন্দীগ্রাম দিবস’ হিসেবে পালন করে সেখানকার ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি। যে কমিটিতে এখনও তৃণমূলেরই রমরমা। তাদের অনুষ্ঠানে প্রতি বছরই হাজির থাকেন তৃণমূল শীর্ষ নেতারা।

সারদা কেলেঙ্কারি নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দূরত্ব চরমে পৌঁছনোর পরে এ বার আলাদা ভাবে নন্দীগ্রাম যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন মুকুল। জানিয়েছিলেন, খোদ নরেন্দ্র মোদী তাঁর কাছে নন্দীগ্রাম সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছেন। নন্দীগ্রাম ঘুরে প্রধানমন্ত্রীকে রিপোর্ট দেবেন তিনি। এ কথা জানার পরেই নন্দীগ্রাম দিবসকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পালন করার নির্দেশ দেন মমতা। দুই মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং ফিরহাদ হাকিম কলকাতা থেকে নন্দীগ্রামে যান ‘শহিদ দিবস’ পালন করতে। ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির মূল অনুষ্ঠানটি ছিল সোনাচূড়ায়, ভাঙাবেড়া সেতুর কাছে শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে। সেখানে ছিলেন তমলুকের তৃণমূল সাংসদ শুভেন্দু অধিকারী, তাঁর বাবা কাঁথির তৃণমূল সাংসদ শিশির অধিকারীও।

এ দিন মুকুলের সঙ্গে নন্দীগ্রামের পথে রওনা দেন ব্যারাকপুরের তৃণমূল বিধায়ক শীলভদ্র দত্ত। পরে সেই দলে যোগ দেন হলদিয়ার তৃণমূল বিধায়ক শিউলি সাহা। এ ভাবে দলছাড়া হয়ে যাচ্ছেন কেন, সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মুকুল বলেন, “এক জন ব্যক্তির শ্রদ্ধা জানানোর অধিকার নেই!” তাঁর আরও দাবি, “নন্দীগ্রামের আন্দোলন তৃণমূল একা করেনি। বিজেপিরও অবদান ছিল। এসইউসি, কংগ্রেস-সহ বিভিন্ন দলও আন্দোলনে ছিল।”

মুকুল রায়কে নন্দীগ্রামে ঢুকতে না দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ টেঙ্গুঁয়ায়। ছবি: পার্থপ্রতিম দাস।

কিন্তু মুকুলকে নন্দীগ্রামে ঢুকতে না দেওয়ার যাবতীয় ব্যবস্থা সেরে রেখেছিল তৃণমূলই। সকাল ১০টা নাগাদ টেঙ্গুয়া মোড়ের কাছে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির কয়েক জন সদস্য। তাঁদের হাতে ছিল ‘মুকুল রায় গো ব্যাক’ লেখা প্ল্যাকার্ড, কালো পতাকা এবং মুখে ‘বিজেপির দোসর মুকুল রায়কে নন্দীগ্রামে ঢুকতে    দেওয়া হবে না’ স্লোগান। টায়ার ফেলে তাঁরা রাস্তাও আটকে দেন। এঁরা সকলেই তৃণমূল কর্মী হিসেবে এলাকায় পরিচিত।

টেঙ্গুয়ার পরে তেখালি সেতুর কাছেও রাস্তার মাঝে একটি মোটরচালিত ভ্যান রেখে মুকুল এবং তাঁর ৮ গাড়ির কনভয় আটকে দেন ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির সদস্যরা। এখানেও দলের সদ্য প্রাক্তন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে ঘন ঘন স্লোগান ওঠে! গাড়ি থেকে নেমে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলতে যান মুকুল। কিন্তু বিশেষ লাভ হয়নি। তাঁর পিছনের গাড়িতে থাকা হলদিয়ার বিধায়ক শিউলি সাহা-সহ কয়েক জন নেমে এসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে শুরু হয় তর্কাতর্কি, ধস্তাধস্তি। মুকুলকেও ধাক্কা দেওয়া হয়। শিউলি বলেন, “আমি নন্দীগ্রামের মেয়ে। আজকের দিনে শহিদ বেদিতে মালা দিতে যাব।” কিন্তু বিক্ষোভকারীরা জানিয়ে দেন, কোনও মতেই তাঁদের নন্দীগ্রামে ঢুকতে দেওয়া হবে না।

বাধার মুখে তেখালি ছাড়ে মুকুলের কনভয়। গাড়িগুলি চলে যাওয়ার সময় কাঠের টুকরো দিয়ে মেরে শিউলির গাড়ির পিছনের কাচ ভেঙে দেয় বিক্ষোভকারীরা। এর পর সঙ্গীদের নিয়ে চণ্ডীপুরের কাছে চলে আসেন মুকুল। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন তাঁরা। ইতিমধ্যে বেলা দেড়টা নাগাদ সোনাচূড়ার অনুষ্ঠান শেষ হয়।

বিকেল তিনটে নাগাদ চণ্ডীপুর দিয়ে ফের নন্দীগ্রামে ঢোকার চেষ্টা করেন মুকুল। কিন্তু ভাঙাবেড়া সেতুর কাছে পৌঁছতেই তাঁকে ফের আটকে স্লোগান দিতে থাকেন ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির লোকেরা। গাড়ি ঘুরিয়ে মুকুলরা চলে যান বটতলায়। সেখানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুকুল বলেন, “৮ বছর আগে অবরুদ্ধে নন্দীগ্রামে ঢুকতে সিপিএম আমায় বাধা দিয়েছিল। আজও বাধা পেলাম! আমি এখানে কোনও অশান্তি চাই না। তাই ফিরে যাচ্ছি।” নন্দীগ্রাম কি তা হলে এখনও অবরুদ্ধ? মুকুলের জবাব, “আমার ক্ষেত্রে অন্তত তাই হল! আজ গণতন্ত্রের পক্ষে সবচেয়ে লজ্জাকর দিন!” সন্ধ্যায় কলকাতায় ফিরে ময়দানে গাঁধী মূর্তির পাদদেশে মোমবাতি জ্বালিয়ে নন্দীগ্রামের শহিদদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা জানান মুকুল ও তাঁর সঙ্গীরা।


নন্দীগ্রামে যাওয়া হল না। কলকাতার মেয়ো রোডেই নিহতদের

শ্রদ্ধার্ঘ্য মুকুল রায়ের। বিশ্বনাথ বণিকের তোলা ছবি।

তাঁর খাসতালুক নন্দীগ্রামে ঢুকতে মুকুল বাধা পাওয়ায় শুভেন্দুর ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। যুব তৃণমূলের সভাপতি যাওয়ার পরে পুরনো বিবাদ ভুলে মুকুলের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন শুভেন্দু। মুকুলের ডানা-ছাঁটা পর্বে ফের তাঁকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন তৃণমূল নেত্রী। দলের সভায় প্রশংসা করার পাশাপাশি শুভেন্দুকে নিজের গাড়িতে বসিয়ে নবান্নে নিয়ে গিয়ে একান্তে আলোচনা করেন। মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের পাশের ছাদ-বাগানে সান্ধ্যভ্রমণও করেন দু’জনে। কিন্তু এর পরেও শুভেন্দুর প্রকৃত অবস্থান কী, তা নিয়ে জল্পনা রয়েছে তৃণমূলে। সেই জল্পনা উস্কে মুকুল এ দিন বলেছেন, “শুভেন্দুর কোনও দোষ নেই। নন্দীগ্রাম আন্দোলনে শুভেন্দুর অগ্রণী ভূমিকা ছিল।”

তাঁকে যাঁরা বাধা দিয়েছেন, তাঁদের সকলের ‘সুবুদ্ধির উদয় হোক’ বলে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনাও করেও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির প্রসঙ্গ তুলেছেন মুকুল। যে মন্তব্য শুনে অনেক রাজনীতিকেরই ব্যাখ্যা, সিপিএম গণতান্ত্রিক রীতিনীতি না-মেনে নির্বাচনী বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। এই পথে চললে তৃণমূলেরও একই পরিণতি হবে, এটাই বোঝাতে চেয়েছেন মুকুল।

শুভেন্দুর অবশ্য দাবি, মুকুলকে বাধা দেওয়ায় দলের কেউ জড়িত নয়। তিনি বলেন, “এ দিনের স্মরণসভা আমাদের দলীয় কর্মসূচি ছিল না। এসইউসি-সহ অন্য দলের নেতারাও অনুষ্ঠানে ছিলেন। শহিদবেদিতে মালা দিতে যে কেউ আসতে পারেন। তবে মুকুলবাবুকে বাধা দেওয়ার বিষয়টি জানা নেই।” ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি শেখ সুফিয়ান মুকুলকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখানো প্রসঙ্গে বলেন, “যারা মুকুল রায়কে বাধা দিয়েছে, তারা আমাদের কেউ নয়। আর এই বাধাদানকে আমরা সমর্থনও করি না।” যদিও বিক্ষোভকারীরা তৃণমূল কর্মী বলেই জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

টেঙ্গুয়া মোড়ে বিক্ষোভকারীদের দলে থাকা সৌরভ সিংহ, বিভাস দাসদের কথায়, “মুকুল রায়কে আমরা দলের নেতা বলে মানি না। উনি এখন দল-বিরোধী কথা বলছেন।” তেখালিতে বিক্ষোভ দেখানো অশোক করণ, খোকন শীট, বাবুল আখতারদের কথায়, “নন্দীগ্রামের আন্দোলন কারও একার নয়। সকলের সমবেত চেষ্টাতেই সাফল্য এসেছে। ফলে এই আন্দোলনের কৃতিত্ব মুকুলবাবু একা দাবি করলে, তা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।” ভাঙাবেড়া সেতুর কাছে বিক্ষোভে সামিল সুব্রত মান্না, দেবব্রত রায়দের আবার বক্তব্য, “উনি এখন বিজেপির হয়ে কথা বলছেন! নন্দীগ্রামের মানুষ এ সব মানতে পারছে না।” সোনাচূড়ার পঞ্চায়েতের নিহত তৃণমূল নেতা নিশিকান্ত মণ্ডলের ছেলে সত্যজিৎ এ দিন স্মরণসভায় ছিলেন। ক্ষোভের সুরে তিনি বলেন, “নন্দীগ্রামকে নিয়ে ক্ষমতার লড়াই চলছে! তবে এ সবে আমাদের কোনও আগ্রহ নেই।”

মুকুলের নন্দীগ্রাম যাওয়া এবং বিক্ষোভকে এক রকম উপভোগই করছেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। এ নিয়ে মুকুলকে বিঁধতেও ছাড়েননি দলের মহাসচিব পার্থবাবু। তিনি বলেন, “উনি কেনই বা এলেন, কেনই বা ফিরে গেলেন, জানি না! তবে উনি আমাদের দলের সহকর্মী। এ ব্যাপারে দলকে অভিযোগ জানালে বিষয়টি দেখা হবে।” একই সঙ্গে তাঁর সংযোজন, “নন্দীগ্রামে অনেকে এসেছেন বলে দাবি করেন। কিন্তু আমরা জানি এখানকার আন্দোলনে ছিলেন আপামর মানুষ।”

শিউলি এ দিন দাবি করেন, মুকুল যে নন্দীগ্রামে আসছেন, তা পুলিশকে জানা হয়েছিল। এমনকী এ দিন মেচেদা পর্যন্ত তাঁদের কনভয়ের সঙ্গে পুলিশ ছিল। তাঁর কথায়, “মেচেদার পরে পুলিশ কোথায় চলে গেল, জানি না! যখন বারবার বাধা দেওয়া হচ্ছে, তখনও পুলিশকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু কেউ আসেনি!” কেন মেচেদার পরে পুলিশ ছিল না, তার সদুত্তর মেলেনি জেলার পুলিশ কর্তাদের কাছে।

শিউলি ছাড়া পূর্ব মেদিনীপুর জেলার আর কোনও নেতাকে এ দিন মুকুলের সঙ্গে দেখা যায়নি। তবে মুকুল ঘনিষ্ঠ জেলা নেতা অখিল গিরি, বিধায়ক অমিয় ভট্টাচার্য, মন্ত্রী সৌমেন মহাপাত্ররা তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে সোনাচূড়ার শহিদ স্মরণে ছিলেন না। প্রত্যেকেই ‘কাজে ব্যস্ত’ বলে অনুষ্ঠান এড়িয়ে গিয়েছেন।

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন