সাদা কাগজে লাল কালিতে হাতে লেখা পোস্টার। নীচে লেখা ন্যাশনাল নকশাল কমিটি ও সিপিআই (মাওবাদী)-র তরফে বরুণ ও মদনের নাম। শুক্রবার ঝাড়গ্রামের জামবনি থানার বেশ কয়েকটি এলাকায় মাওবাদী নামাঙ্কিত এমন পোস্টার মেলায় নড়ে বসেছে পুলিশ। মনে করা হচ্ছে, জঙ্গলমহলে নতুন করে তৎপর হচ্ছে নকশালপন্থী একাধিক সংগঠন। রাজ্য সরকার ও শাসকদলের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের চেষ্টা হচ্ছে। ঝাড়গ্রামের পুলিশ সুপার অভিষেক গুপ্ত বলেন, “কারা ওই পোস্টার দিয়েছে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কিছু সূত্র মিলেছে। পড়শি রাজ্য ঝাড়খণ্ড থেকে এসে কেউ ওই পোস্টার দিয়েছে কি না সেটাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”

এ দিন জামবনির বেলিয়া মোড়, চিল্কিগড়, বালিজুড়ি, মোহনপুর ও বড়শোলের জঙ্গলরাস্তায়, কালভার্টের গায়ে সাঁটানো ও ছড়ানো অবস্থায় মোট ১২টি পোস্টার উদ্ধার করেছে পুলিশ। সবক’টির বয়ান মোটামুটি একই। সেখানে লেখা হয়েছে— ‘নিরীহ মানুষের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে মানুষকে পূর্ণ স্বাধীনতা না দেওয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে মানুষের সামনে আমরা এগিয়ে এসেছি।’ জঙ্গলমহলে যদি সত্যি শান্তি ফেরে তাহলে যৌথ বাহিনী, সিআরপি ক্যাম্প তোলা হচ্ছে না কেন, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে পোস্টারে। যারা অত্যাচার করছে তাদের হুঁশিয়ার করার পাশাপাশি পোস্টারে আরও বার্তা— ‘জঙ্গলমহলের সমস্ত যুবক ভাইদের কাছে আমাদের বক্তব্য, রাজনৈতিক দল বা পুলিশের ধমকানিতে ভয় পাবেন না। আমরা রুখে দাঁড়াব, আন্দোলন গড়ব।’

পোস্টারের এই বিষয়বস্তু গোয়েন্দাদের কপালে ভাঁজ ফেলেছে। তাঁদের ব্যাখ্যা, এই বক্তব্য মাওবাদীদের সাংগঠনিক বিশ্বাস। আর সেই মতো মানুষের ক্ষোভ উস্কে জনমত গঠনের চেষ্টা শুরু হয়েছে। একসময় মাওবাদী-জনসাধারণের কমিটি থেকে যাঁরা তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁদের কয়েকজন গোপনে মাওবাদীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলে গোয়েন্দা সূত্রের খবর। তৃণমূলের একাংশও আড়ালে মানছেন, আদিবাসীদের একটি অংশকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গলমহলে নতুন করে ঘর গোছাতে চাইছে মাওবাদীরা। যদিও তৃণমূলের ঝাড়গ্রাম জেলা কার্যকরী সভাপতি দুর্গেশ মল্লদেব বলেন, “উন্নয়ন বানচাল করে অশান্তি পাকানোর উদ্দেশ্যে কিছু লোকজন ওই পোস্টার দিয়েছে। এখন জঙ্গলমহলে মদন-বরুণদের অস্তিত্ব কোথায়!”

২০১১ সালের নভেম্বরে জামবনিরই বুড়িশোলের জঙ্গলে যৌথ বাহিনীর গুলিতে নিহত হন মাও শীর্ষনেতা কিষেনজি। তারপর জঙ্গলমহলে মাওবাদী সংগঠনে ধস নামে। একের পর এক নেতা-নেত্রী আত্মসমর্পণ করেন। বাকিরা গ্রেফতার হন। আর মাওবাদী-কমিটির একাংশ তৃণমূলে ভেড়েন। গত ছ’বছর জঙ্গলমহলের ভোটেও তৃণমূলের জয়জয়কার। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন এলাকায় ক্ষোভের চোরাস্রোত বইছে। পঞ্চায়েতে দুর্নীতি, শাসকদল ও পুলিশের একাংশের মদতে বেআইনি বালি লরির যথেচ্ছ চলাচল, প্রতিশ্রুতিমতো অলচিকিতে পঠনপাঠন শুরু না হওয়ার মতো বিষয় ঘিরে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশও হচ্ছে। গত জুনেই হয়েছে আদিবাসীদের ‘রেল রোকো’ ও ‘হুল দিবস বয়কট’। তারপর একলব্য স্কুলকে কাঠগড়ায় তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোড়ন ফেলা হয়। সম্প্রতি জামবনিতে সরকারি উদ্যান তৈরির বিরোধিতা করে বেরোয় সশস্ত্র মিছিল। এ সবের পিছনে মাওবাদীদের মদত রয়েছে বলেই মনে করছেন গোয়েন্দারা। তাই পোস্টারের বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রের খবর।