পানীয় জলের দাবি জানাতে এসেছিলেন ওয়ার্ডের বাসিন্দারা। তারপর শাসকদলের কাউন্সিলারের বাড়িতে চড়াও হয়ে ভাঙচুরের অভিযোগ উঠল। মঙ্গলবার রাতে এই ঘটনায় এবং তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের এক নেতাকে মারধরের অভিযোগে তৃণমূলের দুই নেতার বিরুদ্ধে হলদিয়া থানায় পৃথক ভাবে লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়েছে। আর দু’টি ঘটনাতেই শিল্পশহরে আদি ও নব্য তৃণমূলের কোন্দলের তত্ত্ব উঠে এসেছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, হলদিয়া পুরসভার ২২ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর তথা প্রাক্তন শিক্ষক পঞ্চানন ভুঁইয়ার বাড়িতে মঙ্গলবার সকালে একদল লোক জড়ো হয়। প্রথমে পানীয় জলের সমস্যা দূর করার দাবি জানিয়ে তারা বিক্ষোভ দেখায়। একটু পরে তারা বাড়ি চলে গেলেও দুপুরে ফের কাউন্সিলারের বাড়ির সামনে এসে বিক্ষোভ দেখায়। অভিযোগ, এর পরেই উত্তেজিত জনতা ওই কাউন্সিলারের বাড়ি সংলগ্ন তাঁর কার্যালয়ে ঢুকে হামলা ও ভাঙচুর করে বলে অভিযোগ। গন্ডগোলের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান পাশের ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তথা হলদিয়া পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান দেবপ্রসাদ মণ্ডল-সহ কয়েকজন তৃণমূল নেতা। দু’পক্ষের বচসা শুরু হয়ে যায়। সেই সময় তৃণমূলের প্রাক্তন চেয়ারম্যান দেবপ্রসাদবাবুকে হেনস্থা করা হয় বলে অভিযোগ।  একই সঙ্গে আইএনটিটিইউসি সমর্থিত হলদিয়া রিফাইনারি টাউনশিপ মেনটেনেন্স কন্ট্রাক্টর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক উমাপদ পাত্রকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় হলদিয়া থানার পুলিশ। দ্রুত আক্রান্ত তৃণমূল কাউন্সিলর-সহ অন্যদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। শাসক দলের শ্রমিক সংগঠনের জখম নেতাকে হলদিয়া মহকুমা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।

আহত উমাপদবাবুর দাবি, ‘‘দলীয় কাউন্সিলরের উপর হামলার খবর পেয়ে এলাকায় গিয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে পার্টি অফিসে ডেকে পাঠানো হয়। সেই মুহূর্তে যেতে রাজি না হওয়ায় উত্তেজিত হয়ে দলের লোকেরাই আমাকে মারধর করে। আমার জামা-প্যান্ট ছিঁড়ে দেয়।’’ একই দাবি  হলদিয়া পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান দেবপ্রসাদ মণ্ডলেরও। তিনি বলেন, ‘‘পঞ্চাননবাবুর বাড়িতে ঝামেলার খবর পেয়ে সেখানে যাই। কিন্তু অভিযুক্তরা এতটাই উত্তেজিত ছিল যে কোনও কথা শুনতে চায়নি। সকলকে অপমান করা হয়েছে।’’

স্থানীয় সূত্রে খবর, পেশায় শিক্ষক পঞ্চাননবাবু ২০১৭ সালে প্রথম তৃণমূলের টিকিটে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তার আগে প্রকাশ্যে রাজনীতি না করলেও ডানপন্থী দলেরই সমর্থক ছিলেন। তাঁর অভিযোগ, ‘‘অফিসে ঢুকে যে চেয়ার ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে তাও তুলে নিয়ে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। মঙ্গলবার রাতে পৃথকভাবে দুটি অভিযোগ জানানো হয় হলদিয়া থানায়।’’

গোটা ঘটনায় নাম জড়িয়েছে তৃণমূলের স্থানীয় নেতা কঙ্কন ভুঁইয়া-সহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। যিনি আবার হলদিয়া পুরসভার বর্তমান চেয়ারম্যান শ্যামল আদকের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। উল্লেখ্য, হলদিয়াতে পুরসভার সবকটি ওয়ার্ডে তৃণমূল ক্ষমতায় থাকলেও টাউনশিপ এলাকায় গত কয়েক বছর ধরে শাসক দলের মধ্যে দুই গোষ্ঠীর চাপানউতোর বার বার দলকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। তৃণমূলের একাংশের দাবি, আদতে এটা হলদিয়া শহরের আদি ও নব্য তৃণমূলদের সংঘাত। প্রসঙ্গত, আগেও একাধিকবার জেলার পাঁশকুড়ায় শাসক দলের পুরানো ও নতুন কর্মীদের সংঘাত প্রকাশ্যে এসেছে। পরে এক গোষ্ঠীর নেতা আনিসুর রহমান চলে যান বিজেপিতে। অপর গোষ্ঠীর নেতা তথা প্রাক্তন পুরপ্রধান জাকিউর রহমান মারা গিয়েছেন। এ বার লোকসভা ভোটে জেলায় দুটি আসন কাঁথি এবং তমলুকে ধরে রাখতে সমর্থ হলেও জয়ের ব্যবধান কমেছে শাসক দলের। তার পিছনেও দলের আদি এবং নব্য কর্মীদের সংঘাতকে দায়ী করেছেন তৃণমূলের একাংশ। ভোটের পরেও সেই সংঘাত অব্যাহত।

যদিও এ ব্যাপারে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কঙ্কন ভূঁইয়া। তাঁর প্রতিক্রিয়া, ‘‘আমি কিছুই জানি না। মঙ্গলবার আমি বাড়ির বাইরে ছিলাম। তাই কী হয়েছে বলতে পারব না।’’