ঝাঁ চকচকে ভবন। সামনে বড় সাইনবোর্ড। দেখনদারির আড়ালে জেলার অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমই পরিকাঠামোর অভাবে ধুঁকছে বলে অভিযোগ।

সপ্তাহ খানেক আগে বুকে ব্যথা নিয়ে মেদিনীপুর শহরের নান্নুরচকের কাছে এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন মাঝ বয়সী এক ব্যক্তি। ভর্তির পরের দিন ব্যথা আরও বাড়ে। আসেন ওই হাসপাতালের এক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। পরিস্থিতি দেখে তিনি রোগীর পরিজনদের অন্য এক চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন বলে পরিজনেদের দাবি।

রোগীর পরিজনেদের দাবি, মেদিনীপুর মেডিক্যালে কর্মরত ওই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রবীন্দ্রনগরের কাছে এক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বসেন। ওই সেন্টারে গিয়ে অনেক অনুরোধের পর সন্ধে সাড়ে ৭টার সময় তাঁকে আসতে বলেন সেন্টারের মালিক। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে আর দেখা করতে হয়নি। সন্ধে ৭টা ১৫ নাগাদ ওই বেসরকারি হাসপাতালেই রোগীর মৃত্যু হয়।

এক সূত্রে খবর, পশ্চিম মেদিনীপুরে নার্সিংহোম ও বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে ১৩২ টি। এর মধ্যে মেদিনীপুর মহকুমায় ২৪টি, খড়্গপুরে ৫৩টি, ঝাড়গ্রামে ১০টি ও ঘাটালে ৪৫টি। অভিযোগ, ঘিঞ্জি এলাকাতেও বহু নার্সিং হোম গজিয়ে উঠেছে। জেলায় দুই শয্যারও নার্সিং হোম রয়েছে বলে অভিযোগ। অভিযোগ, সব জায়গায় আশঙ্কাজনক রোগীর চিকিৎসার জন্য আইসিইউ, এনআইসিইউ নেই। এমনকী বেশির ভাগ নার্সিংহোমে এক্স- রে, এমআরআই, ইউএসজি-র মতো পরীক্ষার সুবিধাও মেলেনা বলে অভিযোগ।

শহরের এক বাসিন্দার অভিযোগ, যত্রতত্র নার্সিংহোম গজিয়ে উঠছে। এমন জায়গায় নার্সিংহোম তৈরি হয়েছে, যেখানে সহজে বড় গাড়িও ঢুকতে-বেরোতে পারে না। দমকলের ইঞ্জিন তো দূরের কথা! অভিযোগ, অধিকাংশ নার্সিংহোমই রোগীর স্বাচ্ছন্দ্য থেকে মুনাফা বাড়ানোর দিকে বেশি নজর দেয়। অভিযোগ, স্রেফ ট্রেড লাইসেন্স ও স্বাস্থ্য দফতরের সার্টিফিকেট রেখেই ‘ব্যবসা’ চালাচ্ছে একাংশ নার্সিংহোম।

সমস্যা ঠিক কোথায়? সব বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোমে আরএমও (রেসিডেন্ট মেডিক্যাল অফিসার) থাকার কথা। কিন্তু একাংশ নার্সিংহোমে তা রয়েছে খাতায়- কলমে। অভিযোগ, সব সময় চিকিৎসক পাওয়া যায় না। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্সও নেই। ওয়ার্ডবয়রাই সেলাইয়ের কাজ করেন! নেফ্রোলজিস্ট নেই। কাজ চালান টেকনিশিয়ানরা! জেলার একাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারেরও একই হাল। বেশির ভাগ সেন্টারেই চিকিৎসকেরা বসেন। অভিযোগ, লাইসেন্স ছাড়াই চলছে অনেক সেন্টার। নেই প্যাথোলজিস্টও! ফলে, রোগী ও তাঁর পরিজনদের সমস্যায় পড়তে হয়।

রোগীর পরিজনদের একাংশের দাবি, সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার উপরে আস্থা কমেছে। তাই বেসরকারি স্বাস্থ্য ‘ব্যবসা’র রমরমা বাড়ছে। মেদিনীপুরের বাসিন্দা মৌসুমী ত্রিপাঠীর অভিযোগ, “পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে সকলেই চান, তাঁর যেন ভাল চিকিৎসা হয়। এ ক্ষেত্রে বেশি খরচ করতেও অনেকে রাজি থাকেন। কিন্তু সরকারি হাসপাতাল থেকে তো সে ভাবে পরিষেবা মেলে না। এর সুযোগ নিয়ে রমরমিয়ে ব্যবসা করছে একাংশ নার্সিংহোম।”

কেন সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর আস্থা হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ? অভিযোগ, মেদিনীপুর মেডিক্যাল-সহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের একাংশ চিকিৎসক সরকারি হাসপাতালে নামমাত্র সময় থেকে বেশির ভাগ সময়টাই দেন বেসরকারি হাসপাতালে। এ নিয়ে ‘প্রোগ্রেসিভ ডক্টরস্ অ্যাসোসিয়েশন’-র জেলা সম্পাদক কৃপাসিন্ধু গাঁতাইত বলেন, “চিকিৎসকদের এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়। তাও কেন এমন হয় দেখব!”

নিয়মানুযায়ী, জেলার বেসরকারি হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমে মাঝেমধ্যে জেলার স্বাস্থ্য- কর্তাদের পরিদর্শন চালানোর কথা। যদিও তা নিয়মিত হয় না বলেই অভিযোগ। জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক গিরীশচন্দ্র বেরা বলেন, “পরিকাঠামো-সহ অন্যান্য বিষয়ে খামতির অভিযোগ এলে তা খতিয়ে দেখা হয়। প্রয়োজনে পরিদর্শনও করা হয়। তেমন হলে সংশ্লিষ্ট নার্সিংহোমের অনুমোদন বাতিল করে দেওয়া যেতে পারে।” গিরীশচন্দ্রবাবুর আশ্বাস, “নার্সিংহোমগুলোয় সব পরিকাঠামো ঠিকঠাক রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখতে ফের পরিদর্শন হবে।”  রোগীদের সুরক্ষায় গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগ অবশ্য মানতে নারাজ ‘মেদিনীপুর ডিস্ট্রিক্ট নার্সিং হোম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর সহ- সম্পাদক অনুপম নায়েক। তিনি বলেন, “সব অভিযোগ ঠিক নয়! অভিযোগ এলে খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ করা হয়!”