এ যেন কবুতরের মাধ্যমে চিঠি পাঠানোর সেই পুরনো সময়!

শহরের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তের দূরত্ব যেখানে ৫-৬ কিলোমিটার, যেটা অটোয় চেপে মেরেকেটে মিনিট পনেরোয় পৌঁছনো যায় সেখানে একটা চিঠি পৌঁছতে লেগে যাচ্ছে এক সপ্তাহেরও বেশি। দিনের পর দিন ধরে চিঠি পড়ে থাকছে হয় ডাকবাক্সে, না হয় ডাকঘরে। ডাক পরিষেবার এমনই দুর্দশা শহর মেদিনীপুরে।

স্মার্টফোন, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং, ই-মেলের দুনিয়ায় চিঠি এখন দুয়োরানি। পোস্টকার্ড, ইনল্যান্ড লেটার দেখেনি আধুনিক প্রজন্মের অনেক ছেলেমেয়েই। তবে মফস্‌সল শহরে এখনও বহু মানুষ নিয়মিত চিঠি লেখেন। ডাকযোগে পত্র-পত্রিকা পাঠান। ফলে, মেদিনীপুরে জরাগ্রস্ত ডাক পরিষেবায় ভুগছেন অনেকেই। সমস্যা মানছেন কর্তৃপক্ষও। তাঁদের ব্যাখ্যা, কর্মীর অভাবে এই পরিস্থিতি। মেদিনীপুরের সিনিয়র পোস্ট মাস্টার বিকাশকান্তি মিশ্রের কথায়, “শহরে ঠিকমতো চিঠি বিলি হচ্ছে না বলে অভিযোগ পেয়েছি। আসলে কর্মী কম। তাই কিছু সমস্যা হচ্ছে। নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।’’

মেদিনীপুর শহরে ডাক পরিষেবার ২৩টি বিট রয়েছে। প্রতিটি বিটে একজন পোস্টম্যান থাকার কথা। কিন্তু তা নেই। ২৩টি বিটে পোস্টম্যান রয়েছেন মাত্র ৬ জন। তাই চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের নিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। ডাক বিভাগ সূত্রে খবর, চিঠি পৌঁছনোয় দেরির অভিযোগ পেয়ে কিছু দিন আগে নড়েচড়ে বসেন কর্তৃপক্ষ। তিনজন চুক্তিভিত্তিক কর্মীকে সরিয়ে নতুন কর্মী নেওয়া হয়। তাও পরিস্থিতির বিশেষ হেরফের হয়নি। ডাক বিভাগের এক কর্তা জানালেন, অবস্থা সামাল দিতে চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের নিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। তাঁরা সবাই ঠিকমতো কাজ করছেন না বলেই এই পরিস্থিতি।

পরিস্থিতি ঠিক কী রকম?

মেদিনীপুর থেকে প্রকাশিত বহু লিটল ম্যাগাজিন ডাক পরিষেবার উপরে নির্ভরশীল। প্রকাশকেরা ডাকযোগেই পত্র-পত্রিকা পাঠকদের কাছে পাঠান। ‘জ্বলদর্চি’র সম্পাদক ঋত্বিক ত্রিপাঠী বলেন, ‘‘দিন পনেরো আগে মেদিনীপুরের মুখ্য ডাকঘরের ডাকবাক্সে বেশ কিছু চিঠি এবং পত্রিকা ফেলেছিলাম। সেগুলি এখনও শহরের প্রাপকেরা পাননি। অথচ কলকাতার প্রাপকেরা পেয়ে গিয়েছেন।’’ শহরের বাসিন্দা সঞ্জীব ভট্টাচার্যেরও অভিযোগ, ‘‘ডাকযোগে আসা সব পত্র-পত্রিকা সময়ে পাই না। শহরের চিঠি শহরে পৌঁছতে কেন দেরি হয় বুঝতে পারি না!’’ একই মত অভিনন্দন মুখোপাধ্যায়ের। তাঁর কথায়, ‘‘চিঠি লেখায় আগের মতো উৎসাহ নেই ঠিকই। যেটুকু রয়েছে, ডাক বিলির এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে তা-ও হারিয়ে যাবে।’’

ডাক বিভাগের হিসেবমতো চিঠিপত্র দু’রকমের— অ্যাকাউন্টটেবল এবং নন-অ্যাকাউন্টেবল। যে সব চিঠিপত্রের ‘রেকর্ড’ থাকে, যেগুলো প্রাপককে দিয়ে ‘রিসিভ’ করাতে হয়, সেগুলো অ্যাকাউন্টেবল। ডাক বিভাগের এক কর্তার কথায়, “দেখা গিয়েছে, অ্যাকাউন্টেবল চিঠিগুলো সময়ের মধ্যেই বিলি হয়ে যায়। কারণ, এ ক্ষেত্রে একটা চাপ থাকে। চিঠি বিলি না হলে ওই কর্মী বিপাকে পড়তে পারেন। নন-অ্যাকাউন্টেবল চিঠিপত্রই সময়ের মধ্যে বিলি হয় না।’’ ওই ডাক কর্তা আরও জানালেন, মাসে গড়ে এক-একটি বিটে ৬০০-৭০০টি অ্যাকাউন্টেবল এবং ১,২০০-১,৩০০টি নন-অ্যাকাউন্টেবল চিঠিপত্র আসে।

এক সময় চিঠির কদর ছিল ঘরে ঘরে। দুপুরবেলা ‘চিঠি আছে’ ডাক শুনে দ্রুত সদর দরজায় দ্রুত পায়ে আসতেন বাড়ির লোকজন। চিঠির অপেক্ষায় থাকতেন অনেকে। শুধু প্রয়োজন নয়, উৎসবে শুভেচ্ছা জানাতেও চিঠিই ছিল মাধ্যম। সে দিন গিয়েছে। এখন মেসেজ,  রাস্তার ধারের ডাকবাক্সগুলো ধুঁকছে। বেশির ভাগই জরাজীর্ণ। মরছে ধরেছে। এক সময় প্রতিদিন দু’বার করে ডাকবাক্স থেকে চিঠি সংগ্রহ করতেন কর্মীরা। সময়ে চিঠি পৌঁছচ্ছে কি না তা দেখার জন্য ‘পাবলিক রিলেশন ইন্সপেক্টর’ থাকত। অভিযোগ, এখন প্রতিদিন নয়, সপ্তাহে এক-দু’বার খোলা হয় ডাকবাক্সগুলো।

মেদিনীপুরের সিনিয়র পোস্ট মাস্টার বিকাশকান্তি মিশ্রের অবশ্য আশ্বাস, “পরিস্থিতির উন্নতির সব রকম চেষ্টা চলছে। শহরে ডাক পরিষেবার হাল ফিরবেই।” ছবিটা কবে বদলায় সেই অপেক্ষায় শহরবাসীও।