সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অন্য ছবি দেখল শহর মেদিনীপুর।

রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থেকে রথের শোভাযাত্রায় সামিল লোকজনকে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন মতিউর রহমান, তারিফ আহমেদ, শাদ আহমেদ, ইকবাল খানরা। মতিউর বলছিলেন, ‘‘এ দিন পবিত্র ইদের সঙ্গে খুশির দিন। রথ উত্‌সবও ছিল। রথে পুষ্পবৃষ্টি করে সকলের শুভকামনাই করেছি।’’ তাঁর কথায়, ‘‘মেদিনীপুর শহর সম্প্রীতির শহর। সংস্কৃতির শহর। ধর্ম, আচার-আচরণ নিজের কাছে। শহরে আমরা সব ধর্মের মানুষই মিলেমিশে থাকি।’’ মেদিনীপুরের জগন্নাথ মন্দির সংস্কার কমিটির উদ্যোগেই শহরে রথের শোভাযাত্রা বেরোয়। কমিটির সম্পাদক পল্টু সেন বলেন, ‘‘এই শহর সর্বধর্ম সমন্বয়ের এক আদর্শ মঞ্চ।’’

ইদ আর রথযাত্রা ঘিরে শনিবার সকাল থেকেই শহর ছিল উত্‌সবমুখর। সকালে ইদের নমাজ পড়তে মসজিদগুলোয় ভিড় জমে। তার আগে প্রথা গরিব মানুষকে গম বা গমের অর্থমূল্য দান করা হয়। এই ইদ হল ইদ-উল-ফিতর। ফিতর শব্দের অর্থ দান। এক মাসের রোজা শেষে ইদ উপলক্ষে শহরের বিভিন্ন মহল্লাগুলো সাজানো হয়েছিল। চলে দেদার খানাপিনা। কোথাও কোথাও পাড়াতেই চলে বন্ধুদের সঙ্গে চুটিয়ে হইহুল্লোড়। শেখ সাহিল, সরফরাজ খানদের কথায়, “আজকের দিনটা আর পাঁচটা দিনের থেকে একেবারেই আলাদা। এই দিনটার জন্য আমরা সকলেই অপেক্ষা করে থাকি। বন্ধুদের সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা মেরেছি। সঙ্গে খাওয়াদাওয়া তো ছিলই। এরই ফাঁকে শহরেও একটু ঘুরে বেড়িয়েছি। টুকটাক কেনাকাটা করেছি।’’ বিকেল গড়াতেই রঙিন আলোয় সেজে ওঠে মহল্লাগুলো। খুশির আমেজটা যেন আরও ফুরফুরে হয়ে যায়। সিপাইবাজার থেকে কেরানিতলা— সর্বত্র নানা রঙের আলোর সাজ। কোথাও টুনি বাল্ব, কোথাও এলইডি আলোর ঝলকানি।

ততক্ষণে অবশ্য জগন্নাথ মন্দিরের সামনে থেকে রথের শোভাযাত্রা শুরু হয়েছে। শোভাযাত্রা দেখতে রাস্তার দু’ধারে প্রচুর মানুষের সমাগম হয়েছে। রথোত্‌সব উপলক্ষে এ দিন শহরের দু’টি এলাকায় মেলা বসে। একটি জগন্নাথ মন্দির লাগোয়া এলাকায়। অন্যটি শহরের গোলকুয়াচকের কাছে শহরের কলেজ মোড়ের অদূরে। দুপুর থেকেই মেলায় ভিড় জমতে শুরু করে। সন্ধ্যায় শহরের কালেক্টরেট মোড়ে সন্ধ্যারতি হয়। সন্ধ্যারতি দেখলেও প্রচুর মানুষ ভিড় করেন। উত্‌সবের দিনে অনভিপ্রেত ঘটনা এড়াতে প্রস্তুত ছিল পুলিশও। মেদিনীপুরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোয় বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। ছিল পর্যাপ্ত মহিলা পুলিশও। এ দিন সকালে একাধিক মহল্লার সামনে পথচলতি মানুষকে গোলাপ ফুল এবং মিষ্টি দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। সন্ধ্যায় রথের শোভাযাত্রা যাওয়ার সময়ও সব রকম সহযোগিতা করেন এলাকাবাসী। মেদিনীপুর আলম কমিটির সদস্য রাজেশ হোসেন বলছিলেন, “মেদিনীপুর সম্প্রীতির শহর। এখানে যে কোনও উত্‌সবের সঙ্গেই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকেন সবধর্মের মানুষ। এদিন দুই মহোত্‌সবই সুষ্ঠু ভাবে হয়েছে।” স্কুলবাজার, নিমতলাচক, বটতলাচক, কেরানিতলা, কালেক্টরেট মোড়, এলআইসি মোড়, জেলা পরিষদ রোড, কলেজ মোড়, গোলকুয়াচক, ছোটবাজারের পথ ধরেই নগর পরিক্রমা করে জগন্নাথ- বলরাম- সুভদ্রার রথ। রথোত্‌সব ঘিরেও এদিন সকাল থেকে শহরের বিভিন্ন পাড়া ছিল সরগরম।

পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার ভারতী ঘোষ বলেন, ‘‘দুই উত্‌সবই সৌহার্দ্যের মধ্যে দিয়ে পালিত হয়েছে।’’ মেদিনীপুরের বিধায়ক মৃগেন মাইতিরও বক্তব্য, ‘‘এই শহর শান্তির শহর, সম্প্রীতির শহর। এখানে সব উত্‌সবেই সব ধর্মের মানুষ সামিল হন।’’ শহরের নিমতলাচকের অদূরে রয়েছে বেতরা মসজিদ। রথের শোভাযাত্রা যখন এই এলাকার উপর দিয়ে যাচ্ছে, তখনই রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থেকে রথের শোভাযাত্রা পুষ্পবৃষ্টি করেন মতিউর রহমান, তারিফ আহমেদ, শাদ আহমেদ, ইকবাল খানরা। যা খুশির উৎসবে অন্য মাত্রা যোগ করে দেয়।