বাঘে ভয়। বাঘে লক্ষ্মী লাভও!

বনবাসীদের জঙ্গলে যাওয়া কার্যত বন্ধ হয়েছে। টান পড়ছে রুটি-রুজিতে। তবে এই বাঘের টানেই ঠা-ঠা চৈত্রের রোদেও পর্যটকদের একাংশ এখন ঝাড়গ্রামমুখী। ফলে ডোরাকাটায় ভর করে কিছুটা হলেও বাড়ছে পর্যটন ব্যবসা।বিমা সংস্থার কর্মী অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় থাকেন গড়িয়ায়। অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের ভীষণ শখ। লালগড়ে বাঘের খবর জানার পরই ঝাড়গ্রামে যাওয়ার সাধ হয় তাঁর। একটি পর্যটন সংস্থার নম্বর জোগাড় করে  ঝাড়গ্রামে বেড়ানোর তথ্য জানতে ফোন করেন তিনি। ফোনের অপর প্রান্তে থাকা মহিলা বলেন, ‘‘শাল গাছের মাঝে বাঘ দেখতে পাবেন। একেবারে নিরাপদে। তবে এ বাঘ মেলখেড়িয়ার জঙ্গলে ঘাপটি মেরে থাকা হানাদার নয়।’’ তাহলে এ আবার কোন বাঘ?

রহস্যের পর্দা ফাঁস হয়েছিল আরও কিছু সময় পরে। কথা চালাচালির মাঝে গড়িয়ার বিমাকর্মী বুঝেছিলেন, জঙ্গলের বাঘমামা নয়। পর্যটন সংস্থা জুলজিক্যাল পার্কের এনক্লোজারে থাকা চিতাবাঘ দেখানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। ওই এনক্লোজারে রয়েছে চিতাবাঘ সোহেল। জঙ্গলের হানাদারের খোঁজ মিলছে না। তাই তার হয়ে প্রক্সি দেওয়ার কাজে সোহেলকেই ব্যবহার করছে ঝাড়গ্রামের পর্যটন সংস্থাগুলি। ঝাড়গ্রামের একটি অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম সংস্থার কর্ত্রী দেবযানী কর্মকার বলেন, ‘‘লালগড়ের জঙ্গলে বন দফতরের ক্যামেরায় বাঘের ছবি দেখার পর থেকে বেশ কয়েকজন পর্যটক ফোন করে জানতে চাইছেন, গাড়িতে জঙ্গলে বাঘের জায়গায় যাওয়া যায় কিনা। তাদের ঝাড়গ্রাম চিড়িয়াখানায় চিতাবাঘ দেখাচ্ছি।’’ 

লালগড়ের মেলখেড়িয়া ও মধুপুরের জঙ্গলে ঢোকা নিষিদ্ধ করেছে বন দফতর। অগত্যা পর্যটকরা গাড়ি ভাড়া করে লালগড় রাজবাড়ি, ঝিটকার জঙ্গল রাস্তা দেখে আসছেন। টালিগঞ্জের বছর তিরিশের সৈকত দাসের নেশা ছবি তোলা। আট জন বন্ধুর সঙ্গে ঝাড়গ্রামে এসেছেন। উদ্দেশ্য যদি কোনও ভাবে বাঘের ছবি তোলা যায়! অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম সংস্থার সে সাধ্য নেই। লালগড়ের জঙ্গলে প্রবেশ নিষেধ। অগত্যা  ফোন নম্বর জোগাড় করে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে জঙ্গলে ঢোকার অনুমতিপত্র আদায়ের অনুরোধ করেছেন সৈকতবাবুরা। ঝাড়গ্রামের একটি পর্যটন সংস্থার কর্তা সুমিত দত্ত বলেন, ‘‘অন্য বছর দোলের পরে পর্যটকদের চাপটা একেবারেই কমে যায়। এবার পর্যটনের মরশুম শেষ হয়ে গেলেও পর্যটকরা স্রেফ বাঘ দেখার হুজুগেই আসছেন। জঙ্গল মহলের পর্যটনের ক্ষেত্রে এটা অবশ্যই একটা সদর্থক দিক।’’

সপ্তাহান্তে হোটলগুলিতে পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে। পর্যটন দফতরের ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি টুরিস্ট কমপ্লেক্সের ম্যানেজার নিমাইকুমার ঘটকের কথায়, ‘‘রোদের তাপ বাড়লেও এ বার পর্যটকদের ভিড় ভালই রয়েছে।’’ লালগড়ের হানাদারকে তো দেখার সুযোগ হচ্ছে না। তাহলে কেন আসছেন পর্যটকেরা? বাগুইআটির বাসিন্দা দেবদীপ চক্রবর্তী বলছেন, "জলোচ্ছ্বাস দেখতে দিঘা যাই। সূর্যোদয় দেখতে টাইগার হিল। তাহলে বাঘ দেখতে লালগড় যাব না কেন!’’ উলুবেড়িয়ার ব্যবসায়ী সঞ্জয় দে-র কথায়,  ‘‘জঙ্গলে বাঘ এখন থাকুক বা না থাকুক, লালগড় বেড়িয়ে এসেছি শুনে পাড়া-পড়শি ও স্বজন-বন্ধুরা বেশ সমীহের চোখে দেখছেন। কী কী দেখলাম জানতে চাইছেন।’’

ডোরাকাটার ডরে ঘরে সিঁধিয়ে থাকছেন বনবাসীরা। ডোরাকাটার টানে জঙ্গলমুখী পর্যটকেরা। সর্বনাশ, পৌষমাস সবই এই ভরা চৈত্রেই।

(শেষ)