মাঝে ব্যবধান দেড় বছরের। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভগবানপুর-১ ব্লকের মহম্মদপুর ১ গ্রাম পঞ্চায়েতের শেখবাড় গ্রামের বাসিন্দা তৃণমূল নেতা নাণ্টু প্রধান খুন হয়েছিলেন। খুনের পিছনে কারণ হিসাবে উঠে এসেছিল জোর করে চাষের জমিতে ভেড়ি তৈরি নিয়ে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ। ফের সেই একই গ্রাম পঞ্চায়েতে তৃণমূল কর্মীকে খুনের ঘটনা ঘটল।
 
মঙ্গলবার রাতে নিমোকবাড় গ্রামের বাসিন্দা বিশ্বজিৎ বাগ (৩২) নামে ওই তৃণমূল কর্মীকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়। পরে মৃত্যু নিশ্চিত করতে দেহ ইটভাটার নিকাশিনালায় ফেলে দেওয়া হয়। বাবা রতন বাগ দুষ্কৃতীদের দায়ী করে ২০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন ভগবানপুর থানায়। খুনের পিছনে বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতীরা রয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ।
 
এগরা মহকুমা পুলিশ আধিকারিক শেখ আখতার আলি বলেন, ‘‘নিহতের পরিবারের অভিযোগ পেয়ে পুলিশ তিনজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। খুনের ঘটনায় কোনও রাজনৈতিক বিষয় জড়িত রয়েছে কিনা তদন্ত শুরু হয়েছে। এলাকায় সমাজ বিরোধীদের কার্যকলাপ রুখতে পুলিশের টহলদারি বাড়নো হয়েছে।’’
 
নান্টু খুনের পর একই এলাকায় ফের তৃণমূল কর্মী খুনে বিজেপির প্রভাব বাড়াকেই দায়ী করেছে তৃণমূলের একাংশ। কারণ, ভেড়ি কাণ্ডে নান্টু খুন হওয়ার আগে থেকেই মহম্মদপুর-১ পঞ্চায়েতে বিজেপি পা রাখতে শুরু করেছিল। জোর করে চাষের জমিতে ভেড়ি তৈরি নিয়ে নান্টুর বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ সামনে আসার পিছনে বিজেপির প্রভাব ছিল বলে জানা যায়।
 
লোকসভা ভোটে ভগবানপুর-১ ব্লকে পশ্চিমবাড় ও নিমোকবাড় দু’টি বুথে তৃণমূলের চেয়ে এগিয়ে ছিল বিজেপি। এলাকায় ভেড়ি ও ইটভাটায় সমাজবিরোধী কার্যকলাপ বাড়তে থাকায় একাধিক বার এলাকার মানুষ পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, তৃণমূল-বিজেপির লড়াইয়ের সুযোগ নিয়ে এলাকায় দাপট বেড়েছে সমাজবিরোধীদের। বিশ্বজিৎ বাগ খুনের পিছনে সমাজবিরোধীদের কার্যকলাপকেও দায়ী করেছেন বাসিন্দাদের একাংশ।
 
মঙ্গলবার বিকেলে পশ্চিম মেদিনীপুরের সবংয়ের মোহাড়ে মাসির বাড়ি গিয়েছিলেন বিশ্বজিৎ। সেখান থেকে রাত ৯টা নাগাদ মাসির ছেলেকে নিয়ে বাইকে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। পথে দোকানে নিজের মোবাইল ফোন সারান। পশ্চিমবাড়ের ইটভাটার কাছে কাপড়ে মুখ ঢাকা কয়েকজন সশস্ত্র দুষ্কৃতী তাঁকে ঘিরে ধরে। এর পর প্রাণে মারার ভয় দেখিয়ে বাইকের পিছনে থাকা ছেলেটিকে পালাতে বাধ্য করে। এরপর বিশ্বজিৎকে বাইক থেকে নামিয়ে ইটভাটায় তুলে নিয়ে গিয়ে ভোজালি, তরোয়াল দিয়ে কুপিয়ে খুন করে বলে অভিযোগ। ভাঙচুর করা হয় বাইকটি। মৃত্যু নিশ্চিত করতে ইটভাটার নিকাশি নালায় দেহ ফেলে দিয়ে যায় বলে দাবি বাসিন্দাদের। পরে মাসির ছেলের কাছে খবর পেয়ে রাতেই পরিবারের লোকেরা গিয়ে পরিত্যক্ত ইটভাটার নিকাশি নালায় বিশ্বজিতের দেহ দেখতে পান। তাঁর দুই পা এবং হাতে ও মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে পরিবারের লোকজন জানিয়েছেন। পুলিশ দেহ উদ্ধার করে ভগবানপুর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা বিশ্বজিৎকে মৃত বলে জানান।
 
তৃণমূলের ভগবানপুর-১ ব্লক সভাপতি মদনমোহন পাত্র বলেন, ‘‘এলাকায় দলের সক্রিয় কর্মী হওয়ায় বিজেপি চক্রান্ত করে দুষ্কৃতী লাগিয়ে বিশ্বজিৎকে খুন করেছে।’’ অভিযোগ অস্বীকার করে বিজেপির কাঁথি সাংগঠনিক সভাপতি অনুপ চক্রবর্তী বলেন, ‘‘নিহত যুবক দুষ্কৃতী ছিল। কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মী ছিল না। নিজেদের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে গোলমালের কারণেই খুন হয়েছে। এখন বিজেপির উপর দায় চাপিয়ে সত্যকে চাপা দিতে চাইছে তৃণমূল। আমরা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছি।’’ তৃণমূল জেলা সভাপতি শিশির অধিকারী বলেন, ‘‘কারা এই ঘটনায় জড়িত রয়েছে, পুলিশ তদন্ত করছে।’’