• কৌশিক সাহা
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সালার মুজফ্ফর আহমেদ মহাবিদ্যালয়

দফায় দফায় ঘেরাও, ইস্তফা দিলেন অধ্যক্ষ

সকালে তিনি ঘেরাও হয়েছিলেন ছাত্র পরিষদের হাতে। আর দুপুরে তাঁকে ঘেরাও করে রাখল তৃণমূল ছাত্র পরিষদ (টিএমসিপি)। আর তাতে নেতৃত্ব দিলেন এলাকারই তৃণমূল নেতা!

শেষমেশ ইস্তফাই দিলেন সালার মুজফ্ফর আহমেদ মহাবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কাকলি ভৌমিক! বুধবার সন্ধ্যায় তিনি তাঁর ইস্তফাপত্র কলেজ পরিচালন সমিতির সভাপতি শান্তি সাহার কাছে পাঠিয়েছেন বলে কাকলিদেবীর দাবি। তিনি বলেন, “মঙ্গলবার কলেজের বার্ষিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ওই পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে কোনও বিশেষ ছাত্র সংগঠন দলীয় প্রার্থীদের স্বপক্ষে প্রচার করেছে বলে বিরোধী এক ছাত্র সংগঠনের অভিযোগ। যদিও বিষয়টি নজর এড়িয়ে যাওয়া উচিত হয়নি। কলেজ অধ্যক্ষ হিসেবে এটা আমার ব্যথর্তা। ওই ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে নিয়ে আমি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছি। এর বেশি আমার কিছু বলার নেই।” কাকলিদেবী মুখে এই কারণ বললেও কলেজ সূত্রে এবং শিক্ষকদের একাংশ জানিয়েছেন, ঘেরাও-বিক্ষোভের চাপে পড়েই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইস্তফা দিতে বাধ্য হয়েছেন।

এ দিন কলেজে ঠিক কী হয়েছিল?

মঙ্গলবার থেকেই কলেজ কর্তৃপক্ষ ছাত্র সংসদ কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন বলে অভিযোগ। ওই অভিযোগে এ দিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত অধ্যক্ষ-সহ শিক্ষকদের ঘেরাও করে রাখে ছাত্র পরিষদ। খবর পেয়ে সালার থানার পুলিশ কলেজে পৌঁছয়। পরে পুলিশের মধ্যস্থতায় কলেজ কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত ছাত্র সংসদ কার্যালয়ের তালা খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ছাত্র পরিষদ ঘেরাও তুলে নেয়।

ওই ঘটনার আধ ঘন্টার মধ্যেই দুপুর ১টা থেকে ফের ঘেরাওয়ের মুখে পড়েন অধ্যক্ষ-সহ কলেজ শিক্ষকরা। এ ক্ষেত্রে নেতৃত্বে টিএমসিপি। কলেজ পত্রিকায় প্রকাশিত ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদকের লেখা প্রতিবেদন নিয়ে তাদের ক্ষোভ। যদিও সালার কলেজে টিএমসিপি-র ইউনিট নেই। টিএমসিপি-র কয়েক জন পড়ুয়াকে সঙ্গে নিয়ে ভরতপুর ২ ব্লক তৃণমূল সভাপতি মুস্তাফিজুর রহমান নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ওই বিক্ষোভ-ঘেরাওয়ের নেতৃত্ব দেন। তাঁর অবশ্য দাবি, “আমরা কাউকে ঘেরাও করে রাখিনি। ছাত্র পরিষদ কলেজ পত্রিকাকে নির্বাচনী ইস্তাহারে পরিণত করেছে। আমরা তারই প্রতিবাদ জানাচ্ছি।” তিনি জানান, কলেজ পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে ‘ছাত্র পরিষদের প্রার্থীদের পুর্ননির্বাচিত করার’ আহ্বান জানানো হয়েছে। এটা অনৈতিক।

মাস খানেক আগে কৃষ্ণনাথ কলেজ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের লেখা ও বহরমপুরের সাংসদের ছবি প্রকাশ হওয়ায় একই ভাবে টিএমসিপি কলেজ গেটের সামনে বিক্ষোভ দেখিয়েছিল। ওই বিক্ষোভের জেরে কলেজ কর্তৃপক্ষ ‘অনির্দিষ্টকালের’ জন্য ছুটি ঘোষণা করতেও বাধ্য হন। পরিস্থিতি যে তার পরেও বিন্দুমাত্র পাল্টায়নি, এ দিনের ঘটনা তারই প্রমাণ।

প্রসঙ্গত, ওই কলেজে ছাত্র সংসদের ২৪টি আসনের মধ্যে গত বছর ১২টি এসএফআই এবং ১২টি আসনে ছাত্র পরিষদ জয়ী হয়। টাই হওয়ায় টসে জিতে কলেজ ছাত্র সংসদ দখল করে ছাত্র পরিষদ। ছাত্র সংসদের সাধার সম্পাদক আকাশ শেখ অবশ্য কোনও মন্তব্য করতে চাননি। এ দিকে কলেজ শিক্ষকদের ঘেরাও করে রাখার খবর পেয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে ভরতপুর-২ ব্লকের বিডিও অর্ণব চির্না কলেজে উপস্থিত হন। কিন্তু, কলেজে এসে তিনিও টিএমসিপি-র ঘেরাওয়ের মুখে পড়েন। বিডিও পরে বলেন, “সকাল থেকে দফায় দফায় কলেজ অধ্যক্ষ-সহ শিক্ষকরা ঘেরাও হয়ে আছেন জানতে পেরে কলেজ আসি। কলেজে আসার পরে আমাকেও ঘেরাও করে রাখা হয়।” তিন তলা ভবনের দোতলায় কলেজের অফিস ঘর।  বাইরে কেউ যাতে বেরোতে না পারেন, তার জন্য এক তলার কোলাপ্সিবল গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয় শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের সমর্থক বিক্ষোভকারীরা। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদেরও কলেজে ঢুকতে বাধা দেয় তারা।

টিএমসিপি নেতৃত্বের সঙ্গে কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং ব্লক প্রশাসনিক কর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। শেষ পর্যন্ত টিএমসিপি-র চাপের মুখে পড়ে সিদ্ধান্ত হয়, কলেজ পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করার। সেই মতো কলেজ পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করার জন্য বিডিও-এর উপস্থিতিতে সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ ছাত্র সংসদ কার্যালয় খোলা হয়। কিন্তু দেখা যায়, ওই কার্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১১টি কলেজ পত্রিকা পড়ে রয়েছে। এ নিয়েও টিএমসিপি বিক্ষোভ দেখায়। ব্লক প্রশাসন অবশ্য ওই ১১টি পত্রিকাই বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যায়। মুস্তাফিজুর বলেন, “প্রকাশিত ২৭০০ কলেজ পত্রিকার মধ্যে ১১টি বই পড়ে রয়েছে। তা হলে বাকি পত্রিকা কোথায় গেল?” কলেজের ওই পত্রিকা খোওয়া যাওয়ায় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক আকাশ শেখের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করতে হবে বলেও তিনি দাবি জানান।

ওই দাবি মানতে চাননি কলেজ কর্তৃপক্ষ। ফলে রাত আটটা পর্যন্ত টিএমসিপি-র ঘেরাও কর্মসূচি চলে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য কলেজ পত্রিকায় ওই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায় কলেজ অধ্যক্ষ হিসেবে তাঁর ব্যর্থতার কথা কাকলিদেবী লিখিত ভাবে স্বীকার করে নেওয়ায় ঘেরাও তুলে নেয় শাসক দলের ওই ছাত্র সংগঠন। এর পরেই কাকলিদেবী তাঁর ইস্তফার বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। ওই ইস্তফা দেওয়ার প্রসঙ্গে নিজেদের দায় এড়িয়েছে টিএমসিপি এবং তৃণমূল। মুস্তাফিজুর বলেন, “ছাত্র পরিষদের অনৈতিক আন্দোলনের চাপে পড়েই কলেজ অধ্যক্ষ পদ থেকে কাকলিদেবী ইস্তফা দিয়েছেন। ওই ঘটনায় আমরা কোনও ভাবে দায়ী নই।”

মুর্শিদাবাদ জেলা ছাত্র পরিষদের সহ-সভাপতি জয়দেব ঘটক বলেন, “ওই প্রতিবেদনে যা প্রকাশিত হয়েছে, তা ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ব্যক্তিগত মতামত। এ নিয়ে আমাদের কিছু বলার নেই। কলেজ গ্রন্থাগারের মধ্যে তো তৃণমূলের দলীয় পতাকা টাঙানো রয়েছে। আমরা কিন্তু এ নিয়ে কোনও রাজনীতি করি না। আসলে সামনে কলেজ ভোট। তাই ভোটের আগে বাজার গরম করতেই নোংরা রাজনীতি করছে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ।” তাঁর আরও অভিযোগ, টিএমসিপি-র জঙ্গি আন্দোলনের মুখে চাপ সহ্য করতে না পেরেই কলেজ অধ্যক্ষ পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হলেন।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন