প্রতিটি বৈধ ইটভাটার পাশাপাশি জেলায় চলছে প্রায় ১০টি অবৈধ ইটভাটা। জাতীয় পরিবেশ আদালতের কাছে বুধবার জেলা প্রশাসনের জমা-দেওয়া এক হলফনামায় মুর্শিদাবাদে ইটশিল্পের এই ছবিই স্পষ্ট হল। ওই হলফনামার তথ্যে প্রকাশ, জেলায় এখন ২৫৯টি অবৈধ ইটভাটা চলছে।

বহু টালবাহানার পরেই অবশ্য এই হলফনামা জমা দিল জেলা প্রশাসন। তার জন্য ইতিমধ্যেই আদালতে হেনস্থা হতে হয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসনকে। অবৈধ ইটভাটা সংক্রান্ত একটি মামলায় সম্প্রতি জাতীয় পরিবেশ আদালতের (ইস্টার্ন জোন) বিচারক প্রতাপকুমার রায় মুর্শিদাবাদ জেলাশাসককে পাঁচ হাজার টাকা  জরিমানা করেন। কারণ জেলার তরফে জমা দেওয়া হলফনামায় জেলাশাসকের স্বাক্ষর ছিল না, তথ্যেও নানা অসঙ্গতি ছিল। তাই  নতুন করে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন বিচারক। বুধবার নতুন হলফনামা তৈরি করে জেলা প্রশাসন আদালতে জমা দিয়েছে।

প্রশাসন সূত্রে খবর, বছর খানেক আগে জয়দীপ মুখোপাধ্যায় নামে একজন আইনজীবী বর্ধমান, বীরভূম ও মুর্শিদাবাদ জেলায় অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করার আর্জি জানিয়ে জাতীয় পরিবেশ আদালতে (ইস্টার্ন জোন) মামলা করেন। ওই মামলায় মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসন আদালতে যে হলফনামা জমা দেয় তা ‘ত্রুটিপূর্ণ’ এবং তথ্য পরিবেশনে বিভিন্ন ‘অসঙ্গতি’ ছিল বলে জানিয়েছে আদালত। গত ১৯ মার্চ ওই মামলার শুনানি ছিল। ওই দিন জেলা প্রশাসনের তরফে জমা দেওয়া হলফনামা দেখে ক্ষুব্ধ বিচারপতি আর্থিক জরিমানা করেন এবং নতুন হলফনামা জমা দেওয়ারও নির্দেশ দেন। ওই মামলার পরবর্তী দিন আগামী ৭ এপ্রিল।

এর আগে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে আদালত জানতে চেয়েছিল,  মুর্শিদাবাদ জেলায় কতগুলি বৈধ ইটভাটা আছে, কতগুলি ভাটা অবৈধ ভাবে চলছে। কতগুলি ভাটা কর্তৃপক্ষের দূষণ পর্ষদের ছাড়পত্র নেওয়া রয়েছে।  অবৈধ ইঁটভাটাগুলির বিরুদ্ধে প্রশাসন কী পদক্ষেপ করেছে, তাও জানতে চেয়েছিল আদালত।

গত ১৯ মার্চ জমা-দেওয়া হলফনামায় জেলা প্রশাসন ওই সমস্ত তথ্য আদালতে স্পষ্ট ভাবে জানায়নি। সেই সঙ্গে, আদালতের নির্দেশে ওই সমস্ত তথ্য সম্বলিত হলফনামা মুর্শিদাবাদের জেলাশাসককে দিতে বলা হলেও, তিনি না দিয়ে তাঁর অধস্তন এক আধিকারিক হলফনামা দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশে বলা হয়েছে, তপন চট্টোপাধ্যায় নামে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষর করা হলফনামা গ্রহণ করা যাবে না। অবৈধ ইটভাটাগুলি ও তাদের মালিকদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যও ছিল না। কতজন দূষণ নিয়ন্ত্রণের ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেছে, কতজন ছাড়পত্র ছাড়াই ভাটা স্থাপন করেছে এবং কাজ করছে, তার উল্লেখ নেই।   রীতিমতো তিরস্কারের সুরে আদালত বলে, ‘‘এই হলফনামা অস্পষ্ট, এই আদালতের নির্দেশ এড়াতে জমা দেওয়া হয়েছে। তাই তা গ্রহণ করা হল না।’’ ঠিক মতো হলফনামা জমা না দেওয়ার জন্য মুর্শিদাবাদ জেলাশাসককে ৫০০০ টাকা জরিমানাও করে আদালত। ওই টাকা না দিলে পরবর্তী হলফনামা জমা নেওয়া হবে না, তাও বলা হয়।

কেন যথাযথ তথ্য দিতে পারেনি জেলা? জেলা ভূমি ও ভূমি রাজস্ব আধিকারিক অরবিন্দ মিনা বলেন, “জেলা প্রশাসন ঠিক তথ্যই আদালতের কাছে দিয়েছিল। কিন্তু জেলা প্রশাসনের পক্ষে মামলাটি লড়ছেন রাজ্য সরকারের যে আইনজীবী, তিনি আদালতকে ঠিক মতো বোঝাতে ব্যর্থ হন। আদালতের নির্দেশ মতো আমরা সমস্ত তথ্য ফের জমা দিয়েছি।” আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, মামলা শুরুর ঠিক ১৫ মিনিট আগে রাজ্য সরকারের আইনজীবী আদালতে এসে পৌঁছান। ফলে তাঁকে আগে থেকেই মামলা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য বোঝানো সম্ভবনি।

আদালতে যে তথ্য জমা দেওয়া হয়েছে, তাতে উল্লেখ রয়েছে, মুর্শিদাবাদ জেলায় এই মূহূর্তে ২৭টি বৈধ ইটভাটা রয়েছে, ২৫৯টি অবৈধ ইটভাটা চলছে, যারা দূষণ পর্ষদের ছাড়পত্রের জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদনও করেনি। ওই সব ভাটার মালিক দূষণ পর্ষদের ছাড়পত্রের জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছে, এবং এখন পর্যন্ত ১৯টি ভাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ইটভাটা সংগঠনের পক্ষে আবদুল বাকি বলেন, “দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের লাইসেন্স ছিল ৩০০ ইটভাটা মালিকের। কিন্তু আমরা যখন পুনর্নবীকরণের আবেদন করছি, তখন আর নতুন করে লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে না। এতে আমাদের দোষ কোথায়?’’ তাঁর দাবি, গত বছরও ৮৩টি ভাটার বৈধ লাইসেন্স ছিল, এখন তার অনেকগুলির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২৭টিতে। ‘‘টাকা খরচ করে ইটভাটা করেছি, বন্ধ রেখে ক্ষতি করতে তো পারি না। সরকার লাইসেন্স দিলেই আমরা বৈধতা ফিরে পাব,’’ বলেন তিনি।