রানাঘাটের ঘটনায় পুলিশি ব্যর্থতার প্রতিবাদে ফের বিক্ষোভ। এবং সেই বিক্ষোভের জেরে থমকে গেল গোটা শহর। যার প্রভাব পড়ল গোটা জেলাতেই।

সোমবার সন্ধ্যায় রানাঘাটের ওই স্কুল ও হাসপাতালে এসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখান থেকে ফেরার পথে বিক্ষোভের জেরে তিনি আটকে পড়েন মিশন রেলেগেটের সামনে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের উপর। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ওই বিক্ষোভ চলায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে জাতীয় সড়ক ও শিয়ালদহ-রানাঘাট শাখার ট্রেন চলাচল। যানবাহন ও রেল চলাচল স্বাভাবিক হতে রাত এগারোটা বেজে যায়। এই ঘটনায় আটকে পড়েন দূরদুরান্তের বহু মানুষ। চরমে ওঠে ভোগান্তি। আজ, মঙ্গলবার রানাঘাটের ওই ঘটনার প্রতিবাদে মিশন গেট ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে ব্যবসা বন্ধের ডাক দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই এ দিনও জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

কনভেন্ট স্কুলে অপরাধের কিনারা করতে না পারায় পুলিশের ব্যর্থতার ক্ষোভে ফঁুসছে রানাঘাট। শুক্রবার রাতের ওই ঘটনার পরে শনিবার দুপুর থেকেই রানাঘাটে রেল ও ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করে রেখেছিলেন ওই স্কুলের পড়ুয়া, অভিভাবক-অভিভাবিকা ও স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অবরোধের পর পুলিশ প্রশাসন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই দুষ্কৃতীদের গ্রেফতার করবে। সেই প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পরেই অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছিল। সোমবার বিকেলেই সেই প্রতিশ্রুতির ৪৮ ঘণ্টা পূর্ণ হল, কিন্তু একজনও গ্রেফতার হয়নি। কথা রাখতে পারল না প্রশাসন।

 এ দিন দুপুরে ক্যাথলিক অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গলের পক্ষ থেকে একটি মিছিল বার করা হয়। দেবগ্রামের ওই বাসিন্দারা রানাঘাটে এসে বেগোপাড়া ও মিশন গেট এলাকায় প্রতিবাদ মিছিল করেন। এ দিন সন্ধ্যাতেও একটি মিছিল হয়। সেই মিছিলে যোগ দেন স্কুল পড়ুয়া, প্রাক্তনী, স্থানীয় বাসিন্দা-সহ বহু লোকজন। বেগোপাড়া মিশন গেট থেকে প্রায় দু’ কিলোমিটারেরও বেশি পথ সেই মিছিল যায়। ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের উপরে ওই মিছিলের জেরে আটকে পড়ে বহু যানবাহন।  

সন্ধ্যা নাগাদ রানাঘাটের ওই স্কুল ও হাসপাতালে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখান থেকে ফেরার পথে রানাঘাটের ওই স্কুলের সামনেই ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের উপরে বিক্ষোভের মুখে পড়েন মুখ্যমন্ত্রী। বিক্ষোভকারীরা দুষ্কৃতীদের গ্রেফতারের দাবিতে বিক্ষোভ দেখান।

সেই বিক্ষোভের ফলে  শনিবারের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় এ দিনও। ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ও রেল একইসঙ্গে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জনজীবন। বাড়ই ফেরার পথে আটকে পড়েন বহু নিত্যযাত্রী।  এ দিন আইসমালি থেকে মদনপুরে ফিরছিলেন কমলা সিকদার নামে এক বধূ। রানাঘাটে এ দিনের বিক্ষোভে পথে আটকে পড়েন তিনিও। “টিভি দেখে ঘটনার কথা জেনেছি। এতবড় ঘটনায় পুলিশ কিছুই করতে পারল না! আর তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে সবাইকেই।” বলছেন ওই বধূ।

রানাঘাটের কনভেন্টে লুটতরাজ ও সত্তরোর্ধ্ব এক সন্ন্যাসিনীকে ধর্ষণের ঘটনার পরে কেটে গিয়েছে প্রায় তিন দিন। ঘটনার পরের দিন, শনিবার দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করে সিআইডি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সিসিটিভির ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গিয়েছে জনা চারেক দুষ্কৃতীর চেহারা। প্রত্যক্ষদর্শী দু’জন সন্ন্যাসিনীর বর্ণনা অনুযায়ী আঁকা হয়েছে দুষ্কৃতীদের ছবি। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা এসে সংগ্রহ করে গিয়েছেন হাতের ছাপের নমুনাও। এতকিছুর পরেও সোমবার রাত পর্যন্ত ওই ঘটনায় একজনকেও গ্রেফতার করতে পারল না পুলিশ। ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে পুলিশ রবিবার রাত পর্যন্ত মোট দশ জনকে আটক করেছে। ‘কড়া পদক্ষেপ’ কিংবা পুলিশের ‘সাফল্য’ বলতে এইটুকুই! পুলিশ যে দশ জনকে আটক করেছে তাদের কাউকে গ্রেফতার করা হবে কি না, পুলিশের তরফে কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলেনি।

তবে এ দিন মুখ্যমন্ত্রীর সামনে অনেককেই বলতে শোনা গিয়েছে, “পুলিশ ব্যর্থ, ব্যর্থ সিআইডিও। সিবিআইকে দিয়ে এই ঘটনার তদন্ত করানো হোক।” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা বলছেন, “এই ঘটনা গোটা দেশের লজ্জা। এতবড় একটা ঘটনার তদন্ত করতে নেমে কেউই কিছু করতে পারল না। এরপরেও কী করে পুলিশ প্রশাসনের উপর মানুষ ভরসা রাখবে?”

স্কুলের পাশের স্থানীয় এক বাসিন্দা যেমন বলছেন, “আমরা ভেবেছিলাম দিদি এসে আমাদের সঙ্গে কথা বলবেন। আমরাও তাঁকে গোটা বিষয়টি খুলে বলতাম। কিন্তু তিনি তো স্কুলে এসেই আবার ফিরে গেলেন। আমাদের সঙ্গে কথা বললেন না।” এ দিনের বিক্ষোভের পরেও ফঁুসছে রানাঘাট। যে কোনও সময় ফের বিক্ষোভ ও অবরোধের জেরে থমকে যেতে পারে এই শহর। এই আশঙ্কা শুধু রানাঘাটেরই নয়, গোটা জেলার।