কোনও আগাম খবর ছিল না। ‘অর্ডার’ আসতে প্রায় থতমত অবস্থা জেলার পুলিশকর্তাদের। মঙ্গলবার আচমকাই নির্দেশিকা জারি হয়েছে, নদিয়া জেলা পুলিশকে ভেঙে দু’টি পুলিশ জেলা হচ্ছে—কৃষ্ণনগর ও রানাঘাট। কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার সুপার হচ্ছেন জাফর আজমল কিদোয়াই, আর রানাঘাট পুলিশ জেলার সুপার হয়ে আসছেন ভি এস আর অনন্তঙ্গ। দু’দিনের মধ্যে তাঁরা দায়িত্ব বুঝে নেবেন। নদিয়া জেলা পুলিশ সুপারের পদই আর থাকছে না, স্বাভাবিক ভাবেই অপসৃত হচ্ছেন রূপেশ কুমার। 

এই আচমকা ঘোযণায় রাতের ঘুম ছুটেছে পুলিশ কর্তাদের। কারণ, যা-ও বা কৃষ্ণনগরে পুলিশ সুপারের থাকার বন্দোবস্ত আছে, রানাঘাটের পুলিশ সুপার যেখানে থাকবেন সেই কল্যাণীতে কোনও ব্যবস্থাই নেই। আগামী দু’তিন দিনের মধ্যে মোটামুটি একটা পরিকাঠামো খাড়া করতে হবে, যাতে নতুন পুলিশ সুপার এসে তাঁর কাজ শুরু করতে পারেন। তার জন্য আপাতত কল্যাণীতে জুতসই একটা বাড়ি খুঁজছে পুলিশ, যা ভাড়া নিয়ে নতুন পুলিশ জেলার সদর দফতর করা যেতে পারে। কোনও সরকারি ভবন পাওয়া যায় কি না, বা কল্যাণী থানার পুরনো ভবন সংস্কার করে ব্যবহার করা যায় কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যতদিন না মোটামুটি একটা ব্যবস্থা হচ্ছে, নতুন পুলিশ সুপার এসে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের দফতরও ব্যবহার করতে পারেন বলে জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।

বছরখানেক আগেই নদিয়ার পুলিশ সুপার রূপেশ কুমার ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে জেলা পুলিশকে ভেঙে রানাঘাট ও কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলায় ভাগ করার সুপারিশ করেন। কিন্তু আগাম ইঙ্গিত ছাড়াই নবান্ন তা আচমকা কার্যকর করতে চাওয়ায় অপ্রস্তুত জেলা পুলিশের কর্তারা। কারণ ‘পুলিশ জেলা’ মানে একটা বিরাট পরিকাঠামো প্রয়োজন। পুলিশ সুপারের দফতর ছাড়াও আরও নানা দফতর, রিজার্ভ ফোর্সের দফতর, সকলের থাকার জায়গা এবং আরও নানা ব্যবস্থা করতে হয়। তবে পোড় খাওয়া অফিসারের বলছে‌ন, প্রাথমিক ব্যবস্থা করতে পারলেই হল। নতুন পুলিশ সুপার দায়িত্ব নিয়ে নিজের মতো করে গোটা পরিকাঠামো তৈরি করে নেবেন। 

কেন হঠাৎ এ ভাবে নদিয়ার মতো একটা ছোট জেলাকে ভেঙে দুটো পুলিশ জেলায় ভাগ করতে হল? অফিসারেরা জানাচ্ছেন, নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ বাড়ালোর লক্ষ্যে রাজ্যের প্রায় সব জেলাতেই এ ভাবে একাধিক পুলিশ জেলা তৈরি করা হচ্ছে। তবে নদিয়া নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনাও আছে। এই জেলার উত্তরের সঙ্গে দক্ষিণ অংশের শুধু ভৌগোলিক নয়, অপরাধের চরিত্রগত পার্থক্যও আছে। কল্যাণী ও রানাঘাটে খুন এবং অন্য নানা অপরাধ অনেক বেশি ঘটে। রাজনীতির সঙ্গে জড়িত অপরাধও বেশি। কল্যাণী ও তার আশপাশের এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহ, এমনকি অস্ত্র কারখানা তৈরির ঘটনাও আছে। তা ছাড়া কল্যাণী দ্রুত উচ্চশিক্ষার একটা বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। তৈরি হচ্ছে এমস। কল্যাণী ও রানাঘাট মূলত শহরাঞ্চলও বটে। 

অন্য দিকে কৃষ্ণনগর ও তেহট্ট মহকুমার বেশির ভাগটাই গ্রামাঞ্চল। কৃষ্ণনগর ও নবদ্বীপ ছাড়া আর কোনও পুরসভা নেই। নেই কোনও শিল্পও। গোটা এলাকাই মূলত কৃষির উপরে নির্ভরশীল। তার উপরে একটা বিরাট এলাকা জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশ সীমান্ত। সব মিলিয়ে এখানকার অপরাধের চরিত্র আলাদা। পাচার ছাড়াও সীমান্ত সংক্রান্ত অপরাধ, গাঁজা-আফিমের চাষ যার অন্যতম চরিত্র। তা ছাড়া কয়েক বছর আগেও এই এলাকায় একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল মাওবাদীদের প্রভাব। 

জেলা পুলিশের এক কর্তার কথায়, “কৃষ্ণনগরে থেকে এক জন পুলিশ সুপারের পক্ষে এত বড় এলাকা জুড়ে বিচিত্র ধরনের অপরাধ সামাল দেওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল। সেই কারণেই এই সিদ্ধান্ত।” বিদায়ী তথা নদিয়ার শেষ পুলিশ সুপার রূপেশ কুমার বলেন, “আমরা নির্দেশ পেয়েছি। প্রয়োজনীয় সমস্ত রকম পদক্ষেপ করা হচ্ছে।”