• সুদীপ ভট্টাচার্য 
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

জেরবার মুদি, বেলা বাড়তেই উধাও আনাজ

Corona
পাত্রবাজারে ক্রেতাদের ভিড়। সোমবার সকালে। নিজস্ব চিত্র

তখন সবে সকাল সাড়ে ৯টা বাজে। 

ভিড়ে ঠাসা গোয়াড়িবাজারের এক কোণে দেওয়াল ঘেঁষে কয়েকটা ডিম ভর্তি পেটি দেখতে পেয়ে এক খরিদ্দার ‘‘কার ডিম? কার ডিম?’’ করে বেশ কয়েক বার হাঁক দিলেন। কোনও উত্তর না পেয়ে যেই না তিনি একটা পেটিতে হাত দিয়েছেন, একটু দূরে উঁচু বেদিতে বসা ডিম বিক্রেতা ‘সোনার কেল্লা’র জটায়ুর ঢঙে ‘‘এটা আমার!’’ বলে ছুটে এলেন। 

ব্যস, বেধে গেল গোলমাল! বাকি খরিদ্দারেরা সেই দোকানিকে চেপে ধরলেন — ‘‘তবে যে বললেন ‘ডিম শেষ’, এই ডিম এল কোথা থেকে?’’ ধরা পড়ে গিয়ে দোকানি এটা-সেটা বলে ম্যানেজ করার চেষ্টা করলেন বটে, বোঝানোর চেষ্টাও করলেন যে এ সব ডিম আগেই বিক্রি হয়ে গিয়েছে, কিন্তু ক্রেতাদের  চাপের মুখে সেই ডিম তাঁকে তখনই বিক্রি করতেই হল। রেখে দিয়ে পরে বেশি দামে বেচা তাঁর আর হল না। সেখান থেকে খানিক দূরে মুরগির দোকানের সামনে তখন এক খরিদ্দার প্রবল চিৎকার করছেন— ‘‘একটু আগেই ৬০ টাকা কেজি ছিল আর এখন ৭০ টাকা চাইছে?’’ দোকানির পাল্টা— ‘‘কিচ্ছু করার নেই! সকালে ১ কুইন্টাল ৩৪ কেজি মুরগি এনেছি, আনতে না আনতেই সব শেষ। চাহিদা দেখে আবার যেই আনতে গেলাম, দেখি দাম বেড়ে গিয়েছে।’’ 

রবিবার ‘জনতার কার্ফু’র জেরে বাজার বন্ধ থাকায় অনেকে কেনাকাটা করতে পারেননি। সোমবার বিকেল ৫টা থেকে ‘লকডাউন’ হবে শোনার পরে সোমবার সকালে বাজারে হামলে পড়েছেন জেলার ক্রেতারা। কমবেশি সব জিনিসের দাম বেড়ে গিয়েছে। 

সকালেই পাইকারি মাছের বাজার ফাঁকা। করোনা আতঙ্কে আগেই সমুদ্রের মাছ বিক্রি তলানিতে এসে ঠেকেছিল। চালানি মাছ খেতেও লোকে কিন্তু-কিন্তু করছিল। সোমবার সব ভুলে লোকে যা হাতের সামনে পেয়েছে, তা-ই কিনেছে। এমনকি বরফ দিয়ে যেটুকু আগের মাছ ঘরে রাখা ছিল, তা-ও শেষ বলে জানালেন বিক্রেতারা। সমস্ত শাকসব্জির দামই কেজিতে দু’টাকা থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তা সত্ত্বেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাজার ফাঁকা। গোটা জেলাতেই ছবিটা কার্যত এক। 

কৃষ্ণনগর পাত্রবাজারে দুপুর সাড়ে ১২টাতেও দেখা গেল দলে-দলে লোক ঢুকছে বাজারে। কিন্তু আনাজের ঝুড়ি খালি, মাছের বাজার ধোয়ামোছা হয়ে গেছে। শেষমেশ  ঝুড়ি উল্টে দু’চারটে কানা-পচা আলু-বেগুন পাচ্ছেন যে যা পেয়েছেন, নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। ওই বাজারের এক আনাজ বিক্রেতা বলেন, "৫০ গ্রাম টম্যাটো লাগে না যার, সেও ৫০০ গ্রাম চাইছে। রোজই বাজার বসবে, বেশি কিনে নষ্ট করবেন না,  এ সব বোঝাতে গিয়ে নিজেই খারাপ হয়ে গেলাম।’’ নবদ্বীপের আগমেশ্বরী বাজারে তো খরিদ্দারের ভিড় এতটাই ছিল যে তা সামলাতে আর বেশি জিনিস কেনা ঠেকাতে উপ-পুরপ্রধান শচীন্দ্র বসাক সদলে বাজারে নামেন। পাত্রবাজারের আলুর পাইকার গোপাল বিশ্বাস জানান, অন্য দিন তাঁর ঘর থেকে যেখানে বড় জোর দেড়শো বস্তা আলু বিক্রি হয়, সোমবার সেখানে ৩০০ বস্তা বিক্রি হয়েছে। চাহিদা আরও ছিল, কিন্তু মাল ছিল না। এক-এক জন ৫-১০ কেজি করে আলু কিনেছেন। বিক্রেতাদের মতে, বাজার থেকে দ্রুত আলু ফুরিয়ে যাওয়ার আর একটা বড় কারণ, এ দিন স্কুল থেকে পড়ুয়াদের আলু আর চাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত। 

সকাল থেকে মুদির দোকানেও ভিড়ের চাপে নাজেহাল অবস্থা। পাত্রবাজারের মুখে এক মুদির দোকানি প্রদীপ সিংহ রায় রেগেমেগে বলেই ফেললেন, ‘‘এ বার বাধ্য হয়ে শাটার নামিয়ে দিতে হবে। দোকান খুলে ঝাঁট দেওয়ারও সময় দেয়নি, মৌমাছির মতো খরিদ্দারেরা ছেঁকে ধরেছে। যে আড়াইশো গ্রাম তেল নেয়, সে এসে বলছে পাঁচ কেজি দিতে। কিছুতেই বোঝানো যাচ্ছে না যে দোকান রোজ খোলা থাকবে, জিনিসপত্রও আছে অফুরন্ত।’’ ২০০০ সালের বন্যার সময়েও এমন হুড়োহুড়ি দেখেননি বলে জানাচ্ছেন বহু বিক্রেতাই। 

ঝোলা ভরে বাজার করে ফেরার পথে করিমপুরের শান্তনু বিশ্বাস বলেন, ‘‘২৫ কেজি চাল, ৫০ কেজি আলু এবং মুদিখানার মাল কেনা হয়ে গেল, এ বার কিছুটা নিশ্চিন্ত লাগছে।’’ একটু বেলায় বাজারে গিয়ে ক্ষোভও উগড়ে দিয়েছেন অনেকে। এমনই এক ক্রেতা বলেন, ‘‘সকালে ৫ টাকা করে ডিম বিক্রি হচ্ছিল, এখন দেখি ৬ টাকা। পেঁয়াজ ২০ টাকা ছিল সকালে, দুপুরে কী করে ৩০ টাকা নেয়?’’ 

এর ভাবে দাম বাড়ার জন্য কর্তাদের উদাসীনতাকেও দায়ী করছেন অনেকে। প্রশাসনকে মাঠেও নামতে হয়েছে অনেক জায়গায়। যেমন মাজদিয়ায় ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া আলু পুলিশের হস্তক্ষেপে ২২ টাকায় নেমে এসেছে। নবদ্বীপের আগমেশ্বরী বাজারে হিড়িক ঠেকাতে উপ-পুরপ্রধান শচীন্দ্র বসাক সদলবলে বাজারে যান। এ ভাবেই মিটেছে ‘লকডাউন’-এর আগের বিকিকিনি। আজ, মঙ্গলবার থেকে পরিস্থিতি হয়তো একটু শুধরোবে, আশা দোকানিদের।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন