গেরোর নাম জাতীয় নাগরিক পঞ্জী (এনআরসি)! 

কোথাও ঝুলছে পোস্টার— স্থায়ী আধার কেন্দ্র। কোথাও আবার পোস্টার না থাকলেও কয়েকশো টাকা ফেললেই মিলে যাচ্ছে ঝকঝকে ভোটার কার্ড।

আসল-নকলের পরোয়া না করেই গ্যাঁটের টাকা খরচ করে ওই কার্ড সংগ্রহ করতে ভিড় করছেন অনেকেই। তাঁরা বলছেন, ‘‘চারদিকে এনআরসি নিয়ে যা চলছে, বুঝতেই তো পারছেন। একটা কিছু তো হাতে থাক। নইলে কখন কী হয়ে যায়!’’ 

শমসেরগঞ্জের ভাসাই পাইকরের একটি ঘরে যেমন কাজ চলেছে নিঃশব্দে। জনা তিনেক যুবকের চোখ কম্পিউটর স্ক্রিনে। তাদেরকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন জনা বিশেক লোক।

কী চলছে এখানে? থিকথিকে ভিড়টা নির্বিকার গলায় জানাচ্ছে, নতুন আধার কার্ড করানো হচ্ছে। ওই দেখুন, পোস্টার। শুঘু ভাসাই পাইকর নয়, ধুলিয়ান, ফরাক্কা, জঙ্গিপুর, সাগরদিঘিতেও ছবিটা একই রকম। 

যা শুনে রীতিমতো চমকে উঠছেন আধারের দায়িত্বে থাকা রাজ্যের নোডাল অফিসার অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানাচ্ছেন, ৫ মার্চ থেকে রাজ্যে আধার কার্ড তৈরি ও সংশোধনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নির্দিষ্ট কিছু ডাকঘর ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ককে। অন্য কেউ এটা করলে বুঝতে হবে তা জালিয়াতি। 

সোমবার অরূপবাবু বলছেন, ‘‘যে সফটওয়্যারের সাহায্যে এই জালিয়াতি চলছে তার বিস্তারিত বিবরণ পেয়েছি। বিষয়টি কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রককেও জানিয়েছি। রাজ্য সরকারকে বিষয়টি জানাচ্ছি। যারা এই জালিয়াতি করছে ও যারা সেখান থেকে আধার কার্ড তৈরি করছে উভয়েই বিপদে পড়বে। কারণ, এই নকল আধার কার্ডের নম্বর মেশিনে ফেললে সহজেই ধরা পড়ে যাবে।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘যারা জালিয়াতি চালাচ্ছে প্রশাসনিক ভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি মানুষকেও সচেতন হতে হবে।”

ডোমকল সীমান্তের কিছু এলাকায় নগদ কড়ি ফেললেই হাতে গরম মিলছে ভোটার কার্ডও। বছর কয়েক আগে পুলিশ হানা দিয়ে জলঙ্গি ও রানিনগর সীমান্ত থেকে বেআইনি ভোটার কার্ড-সহ বেশ কয়েক জনকে গ্রেফতার করেছিল। এনআরসি-কাণ্ডের পরে ফের তা মাথাচাড়া দিয়েছে বলেই খবর। ওই কাজের দক্ষ এক কারবারির কথায়, ‘‘যে ভোটার কার্ড বাতিল, চুরি বা হারিয়ে যায় সেগুলো সংগ্রহ করা হয়। তার পরে সেই কার্ডগুলো জলে ভিজিয়ে রাখা হয়। কিছু দিন পরে হলোগ্রামটা আলাদা করে হুবহু নকল কার্ড তৈরি করা যায়। এখন ফের এই কার্ডের চাহিদা বেড়েছে।’’ জেলা পুলিশের এক কর্তা বলছেন, ‘‘আমরাও তক্কে আছি। খবর পাকা হলেই হানা দেব।’’

ডোমকলের এক বাসিন্দার দাবি, ‘‘কেবল ভোটার কার্ড নয়, সীমান্ত এলাকায় ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথি টাকার বিনিময়ে সবই নকল মিলছে। এনআরসির গেরোয় কিছু লোক দেদার কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।’’

মুর্শিদাবাদের কমন সার্ভিস সেন্টারের এক মালিক জয়ন্ত পাল বলছেন, ‘‘এখন আধারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কিছু ডাকঘর ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ককে। বাইরে কোথাও আধার কার্ড করার অনুমতি ও সুযোগ নেই। অথচ কিছু অসাধু চক্র জাল কার্ড তৈরি করছে। ডাকঘর ও ব্যাঙ্কের ভিড় এড়াতে অনেকেই সেখানে গিয়ে না জেনেই ঠকছেন। প্রশাসনের অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’’ 

জেলাশাসক জগদীশপ্রসাদ মিনা বলছেন, ‘‘আধার ও ভোটার কার্ড সরকারি ভাবেই করা হয়। লোকজনকে সেখান থেকেই কার্ড করানোর জন্য সচেতন করা হচ্ছে। জালিয়াতির অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা 

নেওয়া হবে।’’