অসুস্থ মানুষের জন্য আরোগ্য নিকেতন রয়েছে। বার্ধক্যে উপনীত হলে রয়েছে বৃদ্ধাবাস। গবাদি পশুর বেলায়? তাদের জন্য না আছে আরোগ্য নিকেতন, না আছে বৃদ্ধাবাস। জমি সঙ্কটের যুগে ভাগাড়ও আর নেই। জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ পুরসভা এলাকায় সেই অভাব পূরণ করেছে শ্বেতাম্বর জৈনসমাজ।

পুরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের রামবাগ এলাকায় ২০ বিঘা জমি জুড়ে গড়ে উঠেছে ধর্মশালার মতো গোশালা। সেখানে বিনা খরচে প্রতিপালিত হয় মালিকের প্রয়োজন ফুরানো অথর্ব, বৃদ্ধ, অসুস্থ গবাদি পশুর। নিয়মিত চিকিৎসা পরিষেবা দিয়ে তাদের সুস্থ করে তোলা হয়। মারা গেলে সেখানেই সমাধিস্থ করা হয়। গবাদি পশুর জন্য এমন ব্যবস্থা রাজ্যে আর দ্বিতীয়টি নেই বলে দাবি, জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ শ্বেতাম্বর জৈনসমাজের। সেখানে প্রতিপালিত হচ্ছে ১৭৫টি গরু, ৩টি ঘোড়া আর ১২-১৪টি সারমেয়।

বয়সের ভারে দুধ দিতে অক্ষম হাড় জির জিরে গাভী, জীবনভর লাঙল টেনেছে এমন বলদ—লাভের বিচারে প্রয়োজন ফুরানো এই গোসম্পদ এক সময় মালিকের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কেউ তাদের কশাইয়ের কাছে সস্তায় বেচে দেয়, কেউ লোকসানের বোঝা নামাতে বাড়ি থেকে বের করে বেওয়ারিশ করে দেয়। ওই সব ‘বাতিল’ প্রাণীদের করুণ দশা দেখে চোদ্দো বছর আগে জন্ম নেয় আজিমগঞ্জের গোশালা। জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ জৈনসমাজের মালিকানায় থাকা ২০ বিঘা জুড়ে গড়ে ওঠেছে সেই গোশালা। পরিচালকও ওই সমাজ।

গোশালার চারিদিকে তোলা হয়েছে ১০-১২ ফুট উঁচু পাচিল। মেঝেয় কংক্রিটের ঢালাই। মাথায় ঢালাই ছাদ। দৈনিক স্নান, খাবারের জলের জন্য বসানো হয়েছে সাবমার্সিবল পাম্পের নলকূপ। শীতের হিমেল ঠাণ্ডা থেকে বাঁচাতে রুম হিটারের ব্যবস্থা রয়েছে। দেখভালের জন্য রয়েছে ১৫ জন কর্মচারি। জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ জৈন সমাজের অন্যতম কর্তা রাজীব চুড়োলিয়া বলেন, ‘‘বহু গৃহস্থ তাঁদের বাতিল হওয়া গাভী ও বলদ নিয়ে হাজির হন গোশালায়। কেউ কোথাও কশাইয়ের হাতে তাঁর পশুকে বেচে দিচ্ছেন সেই খবর পেলেই সেখানে আমরা ছুটে যাই। সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে পশুটিকে নিয়ে এসে শুশ্রুষা করি।’’

রাকেশ বয়েদ নামে এক এমআরপি চিকিৎসকের অধীনে রয়েছে অসুস্থ ও বৃদ্ধ প্রাণীগুলির চিকিৎসার ভার। সপ্তাহে দু’দিন প্রাণী চিকিৎসকও গোশালার পশুদের দেখভালের জন্যে আসেন। রাজীব চুড়োলিয়া বলেন, ‘‘চিকিৎসার পরে কিছুটা সুস্থ হওয়ায় বেশ কিছু গাভীর দুধ দেওয়ার ক্ষমতা ফিরে আসে। গড়ে দৈনিক ৩০ থেকে ৪০ লিটার দুধ মেলে। তবে দুধ আর গোবর বেচে গোশালার মোট খরচের সামান্যই আসে। মাসিক লক্ষাধিক টাকা খরচের বাকিটা আসে দান থেকে।’’

জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ শ্বেতাম্বর জৈনসমাজ সূত্রের খবর, সংস্থার প্রৌঢ় সদস্যা নমিতা বয়েদ গোশালার প্রয়োজন মেটাতে গত ৩ মাসে সংগ্রহ করেছেন প্রায় পৌনে ৩ লক্ষ টাকা। জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জে শ্বেতাম্বর জৈন সমাজের মাত্র ৫০ ঘরের বসবাস। ফলে কেবল তাঁদের সাহায্যে গোশালার বিশাল খরচ মেটানো সম্ভব নয়। অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও স্বেচ্ছায় দান করেন। জানালেন, জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জের শ্বেতাম্বর জৈন সমাজের সম্পাদক সুনীল চুড়োলিয়া।

গোশালাতেই রয়েছে দাদাগুরু ও পরেশনাথের মন্দির। এক কিলোমিটার দূরে রয়েছে রানী ভবানী প্রতিষ্ঠিত বড়নগরের প্রসিদ্ধ টেরাকোটার ও চার বাংলার মন্দির। অনেক মন্দির প্রতিষ্ঠা করে রানী ভবানী ভাগীরথী পাড়ের বড়নগরকে বাংলার বারানসী করতে চেয়েছিলেন। ঐতিহাসিক ওই সব মন্দির দর্শনে আসেন দেশ বিদেশের পর্যটকরা। তাঁরা গোশালা ও গোশালায় থাকা মন্দির দুটি দর্শনেও যান। এ কথা জানিয়ে জৈন সমাজের সম্পাদক সুনীল চুড়োলিয়া বলেন, ‘‘গোশালায় পৌঁছনোর আগে ৩০০ মিটার রাস্তা আজও মাটির। ফলে গ্রীষ্মে ধুলো ও বর্ষায় কাদা। এ কারণে অনেকই গোশালার দোরগোড়া থেকে ফিরে যান। পর্যটকরা স্বচ্ছন্দে গোশালায় যেতে পারলে দানের পরিমাণ বাড়ত। তাতে অর্থ কষ্ট কিছুটা লাঘব হত।’’ এ প্রসঙ্গে জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ পুরপ্রধান শঙ্কর মণ্ডলের আশ্বাস, আর্থিক অনটনের কারণে ওই পথটুকু সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। অর্থের সংস্থান হলেই ওই সমস্যা মেটানো হবে।