— ‘স্যার, সত্যিই কি ছেলেধরা এই এলাকায় ঘুরছে?’

— ‘না, এটা একেবারেই গুজব। এর কোনও ভিত্তি নেই। আমরা তদন্ত করে দেখেছি।’

—‘আচ্ছা স্যার, এই গুজবের পিছনে অন্য কোনও বদ মতলব নেই তো?’

—‘এই বিষয়টি আমরাও খতিয়ে দেখছি।’

বৃহস্পতিবার বিকেলে ডোমকল এসডিপিও অফিসের সভাগৃহে ঘণ্টাখানেক ধরে চলল এমন প্রশ্নোত্তর পর্ব। সীমান্তবর্তী ডোমকল লাগোয়া এলাকায় ছেলেধরার গুজব ছড়াচ্ছে বেশ কয়েক দিন ধরে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, বহু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়ার উপস্থিতি একেবারেই কমে গিয়েছিল। ছেলেধরা সন্দেহে উত্তেজিত জনতার হাতে মার খেয়েছেন বেশ কয়েকজন নিরীহ লোকজন। পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে প্রহৃত হয়েছে পুলিশ। জনতার রোষ থেকে পালিয়ে বেঁচেছেন খোদ বিডিও। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যারা গুজব ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ঘোষণা করেন ডোমকলের মহকুমাশাসক। এ দিন এলাকায় সচেতনতা বাড়াতে পুলিশের তরফে একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে সীমান্ত এলাকার গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, শিক্ষক, বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য-সহ উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় লোকজনও।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মহকুমাশাসকের ওই হুঁশিয়ারির পরে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু তারপরেও বিষয়টি একেবারে বন্ধ হয়নি। সেই কারণেই এ দিনের এই বৈঠক। বৈঠকে যেমন আমন্ত্রিত লোকজনকে অনুরোধ করা হয়েছে, এলাকার মানুষকে বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন করতে। তেমনি ওই বৈঠকে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উঠে এসেছে যেগুলি নিয়ে পুলিশও তদন্ত করছে। কী রকম?

সীমান্ত লাগোয়া জলঙ্গি এলাকার এক গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান এ দিন প্রশ্ন তোলেন, ছেলেধরার গুজব ছড়ানোর পিছনে কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য আছে কি না। এক পুলিশ কর্তা জানান, এই বিষয়টি তাঁরাও খতিয়ে দেখছেন। কারণ, গত পনেরো দিনে যে এলাকায় এই ছেলেধরার গুজব রটেছে সেই রানিনগর, ডোমকল, জলঙ্গি, লালগোলা, ইসলামপুর, করিমপুর এলাকাগুলো একেবারে সীমান্ত লাগোয়া। স্কুল থেকে নাকি ছেলেধরা ছেলেমেয়েদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এমন গুজব শোনার পরেই বাড়ির সকলেই হইহই করে স্কুলে ছুটছেন। সেই সময়ে কিন্তু বাড়ির পুরুষরা মাঠে বা অন্য কোনও কাজে বাড়ির বাইরে থাকছেন। ফলে সেই সুযোগে দুষ্কৃতীরা অনেক কিছুই করতে পারে। সম্প্রতি সীমান্তে ফের গরু পাচার শুরু হয়েছে। আর সেই সময়েই এই গুজব। দু’টো বিষয়ের মধ্যে কোনও যোগ রয়েছে কি না সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিএসএফের এক কর্তা জানান, পাচারের আগে বিশেষ কিছু কৌশল অবলম্বন করে পাচারকারীরা। বর্ডার রোডে আচমকা বোমা ফাটায় তারা। বোমার শব্দে পাহারায় থাকা সব জওয়ান যখন সেদিকে দৌড়ায় তখন ফাঁকা এলাকা দিয়ে মুহূর্তে তারা পাচার করে দেয় গরু কিংবা পাচারের অন্য কোনও সামগ্রী। এসডিপিও অমরনাথ কে বললেন, ‘‘এখন আমরা সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি গুজব ছড়ানো ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে। তাঁদের কয়েকজনকে ধরতে পারলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।’’

স্কুলের শিক্ষকরা জানান, প্রাথমিক স্কুলে এখনও এই গুজবের রেশ কিছুটা রয়েছে। কিছু পড়ুয়া এখনও নিয়মিত স্কুলে আসছে না। প্রশাসনের তরফে  স্কুলে অভিভাবকদের নিয়ে সভা করার কথা বলা হয়েছে। সীমান্তের ওই সব এলাকায় পুলিশ মাইকে করে প্রচার করারও সিদ্ধান্তও নিয়েছে। রানিনগর এলাকার এক স্কুল শিক্ষক জানান, দিনকয়েক আগে ওই গুজবের গুঁতোয় তাঁদের স্কুলে আসাই দায় হয়ে পড়েছিল। ওই শিক্ষক বলেন, ‘‘কে বা কারা এই গুজব ছড়াচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না। অথচ আচমকা অভিভাবকরা স্কুলে এসে হইচই শুরু করছেন। ছেলে হারিয়ে গেলে আমাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। তাঁদের কোনও ভাবেই বোঝনো যাচ্ছে না যে, এটা গুজব। এখন প্রশাসনের পদক্ষেপে কিছুটা হলেও সমস্যা মিটেছে।’’

তবে মুর্শিদাবাদের ডোমকলে গুজবের বিরুদ্ধে প্রশাসন বেশ কিছু পদক্ষেপ করলেও পড়শি জেলা নদিয়ায় প্রশাসনের তরফে এখনও পর্যন্ত তেমন কোনও উদ্যোগ চোখে পড়েনি। অথচ ছেলেধরা গুজবের ছোঁয়া লেগেছে  প্রান্তিক জনপদ করিমপুরেও। দিনকয়েক আগে করিমপুরে বাস থেকে নামিয়ে এক যুবককে ছেলেধরা সন্দেহে বেধড়ক মারধর করে উত্তেজিত জনতা। পরে অবশ্য পুলিশ এসে ওই যুবককে উদ্ধার করে। থানারপাড়ার গমাখালিতেও সম্প্রতি এক মহিলাকে ওই একই সন্দেহে মারধর করে একটি ঘরে বেশ কিছুক্ষণ আটকে রাখে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। পরে পুলিশ গেলে পুলিশকে ঘিরেও বিক্ষোভ দেখানো হয়। এই গুজবের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে কড়া পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন তেহট্টের মহকুমাশাসক অর্ণব চট্টোপাধ্যায়।