চিত্র ১: হরিণঘাটায় এ বার প্রথম ভোট। দাপিয়ে প্রচার চলছে শাসক দলের। পতাকা, ফ্লেক্স, ফেস্টুনে চারিদিক ছয়লাপ। প্রচার করা হচ্ছে পুরবোর্ডের সাফল্যের লম্বা ফিরিস্তি। সিংহভাগ দেওয়াল তৃণমূলের দখলে। প্রচারের শেষ বেলায় দাপিয়ে বাইক মিছিল, একাধিক পথসভায় নিজেদের শক্তি জাহির কিছুই বাদ গেল না। তুলনায় ওই এলাকায় টিমটিম করছে বিরোধীরা। শাসক-বিরোধী, দুই তরফের শরীরি ভাষাই বলে দিচ্ছে কোথাও একটা বড়সড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে!

চিত্র ২: আগের ছবিটার তেমন কোনও বদল চোখে পড়ল না শান্তিপুর কিংবা রানাঘাটেও। সেখানেও তৃণমূলের পতাকা, ফেস্টুনের ভিড়ে বিরোধীদের পতাকা-ফেস্টুন প্রায় ঢাকা পড়ে গিয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রচারের শেষ দিনেও ওই দুই এলাকাতেও অব্যাহত থাকল শাসক দলের দাপট। পথসভা থেকে পদযাত্রা কিংবা বাইক মিছিল নিয়ে এলাকা দাপিয়ে বেড়াতে দেখা গেল তৃণমূলকেই। সেখানে বিরোধীরা কেউ বাড়ি বাড়ি প্রচার কেউ আবার ছোট পথসভা করেই ইতি টানলেন প্রচারে।

পুরভোটের ঠিক আগে কল্যাণী, তাহেরপুর, বীরনগর কিংবা নবদ্বীপেও শাসক দলের এমন প্রভাব দেখে মোটেও স্বস্তিতে নেই বিরোধীরা। ‘ভোটের দিন যে আবার কী হবে!’—এমন  আশঙ্কাও করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নির্বাচনের দিন ঘোষণার পর থেকেই নদিয়ার আটটি পুর এলাকায় তৃণমূল নিজের ক্ষমতা জাহির করে ভোটের প্রস্তুতি শুরু করেছিল। সেই দাপটের বহরে গয়েশপুরে বিরোধীরা সকলেই মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেওয়ায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয় তৃণমূল। 

পুরসভা হওয়ার পরে এই প্রথম ভোট হচ্ছে হরিণঘাটায়। সেখানেও প্রথম ভোটের উচ্ছ্বাসকে ছাপিয়ে গেল সন্ত্রাসের চাপা ফিসফাস। বিরোধী দলের আশঙ্কা, গয়েশপুরে সে ভাবে ভোট না হওয়ায় স্থানীয় তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা সংলগ্ন হরিণঘাটা ও কল্যাণী পুরসভায় দাপিয়ে বেড়াবে। মনোনয়ন পর্ব থেকে শুরু করে ভোটের কয়েক ঘণ্টা আগে পর্যন্ত ‘নীরব সন্ত্রাস’-এর অভিযোগও রয়েছে হরিণঘাটায়। এই পুরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডটি আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছে তৃণমূল। বাকি যে ১৬টি আসনে নির্বাচন হচ্ছে, সেখানেও তৃণমূল ‘নীরব সন্ত্রাস’ চালাচ্ছে বলে অভিযোগ। কেমন ভাবে বাধা দেওয়া হচ্ছে?

বিরোধীদের দাবি, মনোনয়ন জমা দেওয়া সময় থেকেই তৃণমূল তাদের বাধা দিয়েছে। বাধা পেরিয়ে যাঁরা মনোনয়ন জমা দিতে পেরেছিলেন, তাঁদের মনোনয়ন প্রত্যাহারে জোরাজুরি করা হয়। ‘‘মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ভাল, এখন ক’টা দিন বাড়িতেই থাকুন। প্রথম প্রথম এই বলে শাসাত তৃণমূলের লোকেরা। ভোটের মুখে তারাই সরাসরি হুকুম জারি করে বলছে, প্রচারে বেরনোর দরকার নেই’’—হরিণঘাটার জনা কয়েক বিরোধী প্রার্থী এমনটাই বলছেন। বেশ কিছু ক্ষেত্রে পুলিশে অভিযোগ দায়ের হয়েছে। কিন্তু, কাজের কাজ কিছুই হয়নি বলে দাবি বিরোধী নেতৃত্বের।

হরিণঘাটায় সিপিএম ১৪টি ও সিপিআই একটি ওয়ার্ডে প্রার্থী দিয়েছে। তার মধ্যে দু’টি ওয়ার্ডে শাসক দলের চোখ রাঙানিতে সরে দাঁড়িয়েছেন বাম প্রার্থীরা। যাঁরা লড়ছেন, তাঁরাও ভাল মতো প্রচার করতে পারেননি। কংগ্রেসের অবস্থাও তথৈবচ। বিজেপির জনা দশেক প্রার্থী আবার তৃণমূলের হুমকিতে এলাকা ছেড়েছেন। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে শাসক দলের চোখরাঙানিও তত বাড়ছে বলে অভিযোগ বিরোধীদের। বিজেপি, কংগ্রেস কিংবা সিপিএমের জেলা নেতারা সমস্বরে জানাচ্ছেন, তৃণমূলের হুমকিতে কোথাও মনোনয়নপত্র তুলে নেওয়া হয়েছে। কোথাও আবার মনোনয়নপত্র না তুললেও ভয়ে প্রচার করা যাচ্ছে না। যা অবস্থা তাতে ভোটের দিন এজেন্ট দেওয়াটাও কঠিন হয়ে পড়বে। তৃণমূল নেতৃত্ব অবশ্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে।

রাজনৈতিক মহলের পর্যবেক্ষণ, সদ্য সমাপ্ত বনগাঁ উপনির্বাচনের ফলের ভিত্তিতে হরিণঘাটার বেশ কিছু ওয়ার্ডে তৃণমূলকে পিছনে ফেলে দিয়ে এগিয়ে গিয়েছে সিপিএম, বিজেপি। আবার কিছু ওয়ার্ড রয়েছে যেখানে খুব কম ভোটে তৃণমূল এগিয়ে। বিরোধীদের দাবি, এই পরিস্থিতিতে গায়ের জোরে এলাকা দখল করতে ‘নীরব সন্ত্রাস’কে চাঁদমারি করেছে তৃণমূল! নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃণমূলের এক জেলা নেতা কবুল করছেন, ‘‘হরিণঘাটার প্রথম নির্বাচন হচ্ছে তাই নেতৃত্ব কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। ফলে কিছু ক্ষেত্রে বিরোধীদের নজরে রাখতে হচ্ছে।’’ একই সঙ্গে তাঁর দাবি, ‘‘আগে নির্বাচনের সময়ে সিপিএম এলাকার প্রার্থীর বাড়িতে বাড়িতে রজনীগন্ধা ফুল, সাদা থান পাঠাত—তা কি কেউ ভুলতে পারবেন!’’

জেলা তৃণমূলের সভাপতি গৌরীশঙ্কর দত্তের দাবি, ‘‘বিরোধীদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনও যোগাযোগই নেই। এই অবস্থায় নিজেদের মুখ বাঁচাতে সন্ত্রাসের মিথ্যে অভিযোগ করা ছাড়া ওদের কিছুই করার নেই।’’ নদিয়ার জেলাশাসক পি বি সালিমের আশ্বাস, ‘‘ভোট হবে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভাবেই। তার জন্য পুলিশ ও প্রশাসন সব রকম ভাবেই প্রস্তুত।’’

তবে বিরোধীরা সেই আশ্বাসেও আশ্বস্ত হতে পারছেন না!