অনেকে ব্রাত্য, পুড়েছে হাতও
দু’টি দশক ধরে নবদ্বীপ তৃণমূলকে শুধু দিয়েই গিয়েছে। ২০০০ সালে এ রাজ্যে বামেদের ‘সূর্য অস্ত যায় না’ এমন দাপট। তখন নবদ্বীপই নদিয়ার প্রথম পুরসভা যেখানে দু’দশক ধরে ক্ষমতাসীন সিপিএমকে হারিয়ে পুরবোর্ড দখল করে তৃণমূল।
TMC and BJP

—ফাইল চিত্র।

সালটা ১৯৯৮। সবে গঠিত হয়েছে তৃণমূল। কয়েক মাস পরেই ১৯৯৯ সালের লোকসভা ভোট। সদ্যোজাত তৃণমূলকে প্রথম লোকসভা সাংসদ উপহার দিল তৎকালীন নবদ্বীপ লোকসভা কেন্দ্র। তৃণমূলের টিকিটে জিতলেন আনন্দমোহন বিশ্বাস। 

সেই শুরু নবদ্বীপের সঙ্গে তৃণমূলের সম্পর্ক। কিন্তু সেই সম্পর্ক অনেকটাই তিক্ত এখন। 

দু’টি দশক ধরে নবদ্বীপ তৃণমূলকে শুধু দিয়েই গিয়েছে। ২০০০ সালে এ রাজ্যে বামেদের ‘সূর্য অস্ত যায় না’ এমন দাপট। তখন নবদ্বীপই নদিয়ার প্রথম পুরসভা যেখানে দু’দশক ধরে ক্ষমতাসীন সিপিএমকে হারিয়ে পুরবোর্ড দখল করে তৃণমূল। ২৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে বিজেপি একটি এবং তৃণমূল ১৮টি আসনে জয়ী হয়েছিল। ২০০১-এর বিধানসভা নির্বাচনে ফের সিপিএমের বিশ্বনাথ মিত্রকে হারিয়ে বিধায়ক হলেন পুণ্ডরীকাক্ষ ওরফে নন্দ সাহা। নন্দের গড়ে এর পর শহর-গ্রামে এমন কোনও প্রতিষ্ঠান ছিল না যেখানে ঘাসফুল ফোটেনি।

১৯৯৯ থেকে ২০১৯— আনন্দমোহন বিশ্বাস থেকে রূপালী বিশ্বাস। বিশ বছর পেরিয়ে এখন ছবিটা অন্য রকম। লোকের কথাবার্তায় বিগত দু’দশকের সেই আনুগত্যের অভাব স্পষ্ট। চায়ের দোকান থেকে মোড়ের মাথার আড্ডা, সব আলোচনায় ঠিকরে বেরিয়ে আসছে নানা বিষয়ে ক্ষোভ। বিশ্বাস ভেঙে গিয়েছে অনেকটাই, প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার ফাটল চওড়া হচ্ছে। এই ভোট দিল্লিতে সরকার গড়ার, তবু আলোচনায় ঘুরে-ফিরে এসেছে নানা স্থানীয় বিষয়। হাইমাস্টের উজ্বল আলোর নীচে তবু এ কিসের অন্ধকার?    

এক সময়ে সিপিএমের মার খেয়েও যাঁরা ধরে রেখেছিলেন তৃণমূলের পতাকা, তাঁরা এখন অনেকে অদৃশ্য। বরং এমন কিছু মানুষ সেই মিছিলে পা মেলান, যাঁদের দেখে বিস্মিত হয় নবদ্বীপের মানুষ। দলের সুদিনে আসা সুযোগসন্ধানী নব্যদের দাপটে পুরনো তৃণমূল কর্মী-সমর্থকেরা ব্রাত্য হয়ে গিয়েছেন। তলায়-তলায় ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক বইকি! 

শুধু এ-ই নয়। ২০০০ সালের পুরভোটে তৃণমূল ক্ষমতায় এসেছিল পুরকর কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে। তৎকালীন সিপিএম বোর্ড কর বাড়িয়েছিল। তৃণমূল তা নিয়ে বন্‌ধ পর্যন্ত ডাকে। বলে, বর্ধিত পুরকর ফেরত দেবে। এখন কিন্তু ফের সেই করবৃদ্ধি নিয়েই ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বাণিজ্যপ্রধান শহরে ট্রেড লাইসেন্সের হার বৃদ্ধি, চড়া ‘ডেভলপমেন্ট ফি’ নিয়েও চাপা ক্ষোভ কাজ করছে। 

তার উপরে বৈষ্ণবতীর্থ নবদ্বীপে ধর্মীয় পরিমণ্ডলের দরুণ একটা মৃদু হিন্দুত্ববাদী মানসিকতা সব সময়েই থাকে শহরবাসীর একাংশের মনে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্ষোভ। তার উৎসে তৃণমূলের কুচো নেতাদের কোন্দল যেমন আছে, কিছু নেতার বাড়বাড়ন্ত দেখে চোখ টাটানো তো আছেই। গত দু’দশক নবদ্বীপকে অনেকটাই আগলে ধরে রেখেছিলেন নন্দ সাহা। ঘোরতর অসুস্থ হওয়ায় এই প্রথম তাঁকে ছাড়াই ভোট হয়েছে নবদ্বীপে। পুরপ্রধান বিমানকৃষ্ণ সাহা একাই সামলেছেন যাবতীয় ভোটের ধকল। কিন্তু পুরসভার বিরুদ্ধে ক্ষোভ মানে তো তাঁর বিরুদ্ধেই ক্ষোভ? 

বিমানকৃষ্ণ অবশ্য তা মানতে রাজি নন। তাঁর দাবি, “মানুষ দেখেছেন, নবদ্বীপ কী ছিল আর কী হয়েছে। তাঁরা আমাদের সঙ্গেই আছেন।”