• সম্রাট চন্দ
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

‘তোদের তো এ দেশে নিজেদের জমিই নেই, তোরা এ দেশের লোকই না!’

জেলায় প্রশাসনিক সভা করতে‌ এসে রাজ্যের জমিতে থাকা ১৫টি উদ্বাস্তু কলোনিকে দ্রুত অনুমোদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেমন হাল কলোনিগুলির? কারা থাকেন সেখানে? কী বলছেন তাঁরা? খোঁজ নিচ্ছে আনন্দবাজার।

shantigarh
শান্তিগড়। নিজস্ব চিত্র

বাংলাদেশ থেকে ভিটে-মাটি হারা হয়ে এ দেশে এসেছিলেন তাঁদের বাপ ঠাকুর্দারা। মাথা গোঁজার জায়গা পেয়েছিলেন কলোনিতে। কিন্তু আজও এ দেশে ভূমিহারা তাঁরা। প্রজন্ম পেরিয়ে গিয়েছে, কলোনির জমির দলিল পাইনি কেউই।

শান্তিপুরের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সুত্রাগড় চরের বাসিন্দাদের গলায় ক্ষোভের থেকেও বেশি অভিমান, ‘‘এই টুকু কি দেওয়া যেত না আমাদের? কারও সঙ্গে ঝামেলা হলেই সে জমি নিয়ে খোঁটা দিয়ে বলে, ‘তোদের তো এ দেশে নিজেদের জমিই নেই। তোরা এ দেশের লোকই না!’ আমাদের মুখ চুন হয়ে যায়।’’ ১৯৬৮ সালে‌ শান্তিপুর শহরের প্রান্তে গড়ে উঠেছিল সুত্রাগড়চর সুর্যসেন কলোনি। প্রায় ৮৫টি উদ্বাস্তু পরিবারের বাস এখানে। কেউই জমির মালিকানা পাননি। কলোনিতে এখনও কাঁচা রাস্তা। কোনও উন্নয়ন নেই। বর্ষায় কাদা প্যাচপ্যাচে পথ। সেই পথে রাতে আলোও জ্বলে না।

স্থানীয় বাসিন্দারাই বলছেন, একাধিক বার জমির দলিলের জন্য আবেদন করার পরেও কোনও ফল হয়নি। জমির মালিকানা অধরা থেকেছে। উন্নয়ন, সরকারি সুযোগ সুবিধা, কিছুই পাননি। আশায় আছেন, মুখেযমন্ত্রীর আশ্বাসের পর যদি এত দিনে দুঃখের দিন শেষ হয়।

শান্তিপুরের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের শ্যামাপল্লি গড়ে উঠেছিল ৬০ এর দশকের শেষের দিকে। স্থানীয়দের কথায়, এক শ্যামাপুজার দিনে উদ্বাস্তুদের জন্য এই কলোনিতে বসতি তৈরি হয়। তাঁর থেকেই এর নাম শ্যামাপল্লি। সেই পুজো আজও হয়ে আসছে। বর্তমানে এখানে ২৫টি পরিবার বসবাস করে। স্থানীয় বাসিন্দা আনন্দ রায় বলেন, “আমি তখন খুবই ছোট। বাবা-মায়ের কাছে শোনা, যশোহর থেকে এ দেশে এসে বনগাঁ হয়ে গাইঘাটায় ছিলাম কিছু দিন। তার পর এখানে উদ্বাস্তুদের বসতি শুরু হলে চলে আসি।” নোয়াখালির দাঙ্গার সময়েই বাবা-মায়ের সঙ্গে এ দেশে চলে আসেন রমেশ দেবনাথ। এই রকম ভাবে এখানকার প্রায় সব বাসিন্দাই বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ও পার বাংলা থেকে নিরাপত্তা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছিলেন এ দেশে। কিন্তু ভিটে-ভূমি হারিয়ে এ দেশে এসেও এখনও কার্যত ভূমিহীন তাঁরা। উদ্বাস্তু তকমাও রয়ে গেছে। সরকারি প্রকল্পের সুযোগ সুবিধাও জোটেনি বলে অভিযোগ।

শান্তিপুরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের চৈতন্যপল্লি গড়ে উঠেছিল ১৯৬৯ সালে। বর্তমানে প্রায় ১০০-র মতো পরিবার থাকে। জমির মালিকানা পায়নি কেউই। পাণীয় দলের সংযোগ, ঋণের সুবিধা, সরকারি আবাস প্রকল্পের সুবিধা—কিছুই পান না তাঁরা। স্থানীয় বাসিন্দা বিনোদ বিশ্বাস বলেন, “যখন আট বছর বয়স বাবা-মায়ের সাথে যশোহর থেকে এ দেশে হাঁসখালিতে আসি। এর পরে শান্তিপুরে বসতি গড়ে উঠলে সেখানে চলে আসি।”

স্থানীয় বাসিন্দা রবীন্দ্রনাথ হালদার বলেন, “প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে কুষ্ঠিয়া থেকে বাবা-মায়ের সাথে দর্শনা হয়ে গেদেতে আসি। সেখান থেকে রানাঘাট হয়ে শান্তিপুর স্টেশন। স্টেশন থেকে পায়ে হেঁটে বাগআঁচড়ায় এক আত্মীয়ের বাড়ি উঠি। কিন্তু আজও জমির মালিকানা পেলাম না।” স্থানীয় বাসিন্দা বিকাশ সান্যালের কথায়, “নব্বইয়ের দশক থেকে উদ্বাস্তুদের জমির মালিকানা দেওয়ার জন্য আন্দোলন করে এসেছি। বহু বার প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছি। এ বার যদি ইতিবাচক কিছু হয় সে দিকেই তাকিয়ে আমরা।” ১ ও ২ নম্বর শান্তিগড় কলোনির বাসিন্দাদের কথাতেও একই বক্তব্যের প্রতিধ্বনী শোনা গিয়েছে।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন