পাড়ে দাঁড়িয়ে স্বরূপগঞ্জের সুবল বর্মণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “নদীটা যা হয়ে গেল, খড়েতে আর কোনও দিন মাছ পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ!” 

বছর পঁয়ষট্টির মৎস্যজীবী সুবলের এ সব কথা কালো জলে ভরা খড়ে তথা জলঙ্গির পাড়ে দাঁড়িয়ে শোনে কার সাধ্য! দুর্গন্ধে গা গুলিয়ে উঠছে। দ্রুত পা চালিয়ে নদীর পাড় থেকে সরে এসেও রেহাই নেই। এ পারে স্বরূপগঞ্জ, ও পারের মায়াপুর জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে কাজল নদীর পচা জলের দুর্গন্ধ।

জলঙ্গি যেখানে গঙ্গায় মিশেছে, সেই স্বরূপগঞ্জ বা মায়াপুর অঞ্চলের মানুষের এমন অভিজ্ঞতা বলতে গেলে এই প্রথম। বেশ কয়েক দিন হল, স্বরূপগঞ্জের কাছে জলঙ্গি পচা জলে ভরে গিয়েছে। সেই সঙ্গে তীব্র দুর্গন্ধ। সবুজ পান্নারঙা নদীর চেহারাটা আমূল বদলে গিয়েছে। নবদ্বীপ থেকে গঙ্গা পার হয়ে মায়াপুর যেতে গেলে মাঝনদীতে গঙ্গা-জলঙ্গির সঙ্গম বিস্ময় জাগায় পর্যটকের মনে। গেরুয়া গঙ্গা আর সবুজ জলঙ্গির মিলনস্থলকে ভক্তেরা ‘রাধাকৃষ্ণ’ জ্ঞান করেন, নৌকা করে ওই জায়গা পার হওয়ার সময়ে নদীকে প্রণাম করেন। 

কিন্তু এখন জলঙ্গির চেহারা দেখে আঁতকে উঠছেন সকলে। গাঢ় কালো পচা গন্ধযুক্ত জলে কী করে ভরে উঠল জলঙ্গি, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। আজন্ম নদীপাড়ে বেড়ে ওঠা সুবল বলেন, “জলঙ্গি এমনিতেই রোজ একটু একটু করে মরে যাচ্ছে। নানা রকম অত্যাচার চলছে নদীর উপরে। ফলে শুধু নদী নয়, আমাদের মতো নদী-নির্ভর মানুষেরাও মরছি। তবে কালো জলের এই জিনিস সেই অর্থে এই প্রথম দেখছি।’’ 

তাঁরা জানান, এক বছর আগেও এক বার এমন কালো জল এসেছিল। তবে সে বার দিন তিনেকের মধ্যে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এ বার পনেরো দিনেরও বেশি পার হয়ে গিয়েছে। প্রতি দিন জল আরও কালো হচ্ছে। আরও দুর্গন্ধ বাড়ছে। মাছ তো বটেই, শামুক-ঝিনুক-গুগলিও মরে-পচে সাফ হয়ে গিয়েছে। এখনও জল পরিষ্কার হওয়ার লক্ষণ নেই।”

স্থানীয় মৎস্যজীবীরা জানাচ্ছেন, এখনও বর্ষার সময়ে নদীতে নেই-নেই করে আড়াই-তিন কেজি ওজনের রুই, কাতলা মেলে। এ ছাড়া পুঁটি, ভেদা, বেলে, বোয়াল, ট্যাংরা, আড়ট্যাংরার মতো মাছও যথেষ্ট পরিমাণে ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন কালো পচা জলে সেই মাছ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, শুধু পাট পচা জলে এমনটা হতে পারে না। নিশ্চয় অন্য কিছু ঘটছে কোথাও। সরকার ব্যবস্থা নিক। 

অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, মায়াপুরে যেতে নিত্যযাত্রীর দল নবদ্বীপ থেকে লঞ্চ ব্যবহার করছেন না। তাঁরা নৌকায় যাতায়াত করছেন। কেননা মায়াপুরে নৌকার জেটি গঙ্গায়, কিন্তু লঞ্চের জেটি জলঙ্গিতে। নদীপারের বাসিন্দা তথা নবদ্বীপ জলপথ পরিবহণ সমবায় সমিতির কর্মী লাল্টু ভুঁইয়া বলেন, “ছোট থেকেই জলঙ্গি দেখছি। এমন কোনও দিন হয়নি। নদী তো নয়, যেন একটা বিরাট নর্দমা। অনবরত পচা জলে বয়ে আনছে গঙ্গায়। এখন নবদ্বীপের ঘাট থেকে পচা জলের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।” 

নাজেহাল এলাকার মানুষ বিহিত চাইছেন। স্বরূপগঞ্জ পঞ্চায়েতের প্রধান সিরাজ শেখ বলেন, “আমরা তো বুঝতেই পারছি না, কেন এমন হোল। বাংলাদেশের দর্শনার এক কারখানার ছাড়া রাসায়নিকে চূর্ণীতে এমন হয়, শুনেছি। জানি না কোনও ভাবে সেই জলকি জলঙ্গিতে চলে এল কি না।’’ যদিও ভৌগোলিক ভাবে সেই সম্ভাবনা কার্যত নেই। সিরাজ বলেন, ‘‘বিহিত চেয়ে বিভিন্ন জায়গায় জানিয়েছি। এখনও সুরাহা হয়নি।” নবদ্বীপের বিডিও বরুণাশিস সরকার বলেন, “মৎস্য দফতর এ বিষয়ে অনুসন্ধান করছে। জলঙ্গির কেন এই হাল, তার কারণ অনুসন্ধানের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিত ভাবে জানিয়েছি। তাঁদের উত্তরের অপেক্ষায় আছি।”

নদী বিশেষজ্ঞ সুপ্রতিম কর্মকারও মনে করেন, “শুধু পাট পচানোর কারণে এমন অবস্থা হতে পারে না। জরুরি ভিত্তিতে অনুসন্ধান করতে হবে, নদী তীরবর্তী অঞ্চলের কোনও জায়গা থেকে সকলের অগোচরে কোন রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে কি না। তবে সবটাই করতে হবে দ্রুত। নতুবা জলঙ্গি হারাতে বেশি সময় লাগবে না।”