বহরমপুরে খবির শেখকে পিটিয়ে খুনের ঘটনায় পুলিশ দু’জনকে গ্রেফতার করল। বুধবার রাতে তাদের গ্রেফতার করা হয়। ধৃত ওষুধ দোকানের মালিক অশোক বড়াল ও চিকিৎসকের সহযোগী রঞ্জিৎ বিশ্বাসকে বৃহস্পতিবার বহরমপুরে সিজেএমের এজলাসে তোলা হলে বিচারক তিন দিন পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। 

নিহতের কাকা সামিন শেখ বুধবার রাতে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। পুলিশ, খুন, বেআইনি ভাবে আটক-সহ মোট তিনটি ধারায় মামলা রুজু করেছে। ধৃত ওই দু’জন- সহ আরও অনেকে জড়িত আছে বলে অভিযোগে জানানো হয়েছে। মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপার মুকেশ কুমার বলেন, ‘‘খুনের অভিযোগ পেয়ে মামলা করা হয়েছে। দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’’

সামিনের অভিযোগ, ‘‘ভাইপো সেখানে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিল। চিকিৎসকের সহযোগী নিয়ম ভেঙে অন্য লোকজনকে চিকিৎসকের চেম্বারে ঢোকাচ্ছিল। তার প্রতিবাদ করায় ওই দোকানের মালিক, চিকিৎসকের সহযোগী আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে আমার ভাইপোর হাত-পা বেঁধে মারধর করে।’’ শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে খবির কাকে নিয়ে গিয়েছিলেন? সামিনের দাবি, ‘‘ওখানে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ছাড়া আরও অনেক চিকিৎসকের চেম্বার। তাঁদের কারও কাছে ভাইপো গিয়েছিল।’’ 

কোন পথে খবির-খুন

 সকাল ৬.৩০: আব্দুল কাফির শেখের বাড়িতে রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন খবির।
• ৯.৩০: কাফিরের মোটরবাইক চেয়ে নিজের বাড়িতে আসেন।
• ১০টা: বাড়ি থেকে মোটরবাইকে বহরমপুর।
• সাড়ে ১০টা: বহরমপুরের ভাগীরথী সেতুর কাছে চাবি-সহ মোটরবাইক দাঁড় করানো ছিল। পরে ট্রাফিক পুলিশ সেটি উদ্ধার করে।
• ১০.৪৫: হন্তদন্ত হয়ে বহরমপুরে লালদিঘির পাড়ে একটি ওষুধের দোকানে যান। কিছুক্ষণ পরে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের চেম্বারে ঢুকে পড়ে অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে। ভিতর থেকে খবির দরজা বন্ধ করে দেন বলে অভিযোগ।
• ১১টা: শিশুরোগ বিশেষজ্ঞর চেম্বারে গন্ডগোল হচ্ছে খবর পেয়ে কাছাকাছি ক্ষুদিরাম মোড়ে কর্তব্যরত ট্রাফিক ওয়ার্ডেন (পুরসভার অস্থায়ী কর্মী) ছুটে যান। ডাকাডাকির পরে দরজা খুলতেই সেখানে উপস্থিত লোকজন খবিরের হাত পা বেঁধে মারধর করে বলে অভিযোগ। 
• সাড়ে ১১টা: পুলিশ খবিরের দেহ উদ্ধার করে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে চিকিৎসকেরা মৃত বলে জানান।
• দুপুর ২টো: পুলিশ দোকানের মালিক, চিকিৎসকের সহযোগী-সহ তিন জনকে আটক করে।
• সন্ধ্যা ৬টা: বহরমপুরের উত্তরপাড়া মোড়ে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কে অবরোধ।
• রাত ৯.১৫: লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পরে বহরমপুর থানার পুলিশ দু’জনকে গ্রেফতার করে।

বুধবার সকালে বহরমপুরের লালদিঘির পাড়ে একটি ওষুধ দোকান লাগোয়া চিকিৎসকের চেম্বারে মুকুন্দপুরের খবির শেখের (৩১) গণপিটুনিতে মৃত্যু হয়। চিকিৎসকের সহযোগী রঞ্জিত বিশ্বাসের দাবি, ‘‘ওই যুবক অস্বাভাবিক আচরণ করছিল। নিষেধ উপেক্ষা করে চিকিৎসকের চেম্বারে ঢুকে এসি চালিয়ে দেয়। লাইট ভেঙে দেয়। ভিতর থেকে একটি ফ্যান ছুড়ে মেরে দরজা বন্ধ করে দেয়।’’ রঞ্জিতের দাবি, পুলিশ ওই যুবককে বের করেছিল। কারা মারধর করেছে তার কিছুই তিনি জানেন না। দোকান মালিক অশোক বড়ালও তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।  

ধৃত দোকান মালিক, চিকিৎসকের সহযোগী। 

এমন যুক্তি মানতে নারাজ খবিরের পরিবার ও পড়শি। পেশায় রাজমিস্ত্রি খবির তাঁর প্রতিবেশী আব্দুল কাফিরের বাড়িতে কাজ করছিলেন। আব্দুল কাফিরের স্ত্রী হাসনাবানু বিবি বলেন, ‘‘বুধবারেও খবির কাজ করছিল। ৯টার দিকে সে বলে, ‘বহরমপুরে ওষুধ আনতে যাব। পেরেক, পলিথিনও লাগবে। তোমাদের মোটরবাইকটা দাও।’ মোটরবাইক নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরে খবর আসে ওকে পিটিয়ে খুন করা হয়েছে।’’

প্রশ্ন যেখানে

   খবির শেখ বহরমপুরে কেন এসেছিলেন? বহরমপুরের লালদিঘিপাড়ের কাছে ওই ওষুধের দোকানেই বা কেন এসেছিলেন? 
 ওষুধ দোকান লাগোয়া চিকিৎসকের চেম্বারে খবির শেখ এমন কী ঘটনা ঘটিয়েছিলেন যার জন্য তাঁকে খুন হতে হল?
   চাবি-সহ মোটরবাইক ঘটনাস্থল থেকে প্রায় দু’কিলোমিটার দূরে ছিল কেন? সেখান থেকে খবির ওই ওষুধ দোকানে কী ভাবে পৌঁছলেন?
 খবিরকে কারা মারধর করল? দোকানের কর্মী ও চিকিৎসকের সহযোগী ছাড়াও কি রোগীর পরিজনেরা যোগ দিয়েছিলেন?
   লালদিঘির পাড়ের মতো জনবহুল স্থানে এ ভাবে এক যুবককে পিটিয়ে মারলেও কেউ আটকালেন না কেন? পুলিশই বা কী করছিল?

সূত্র: জেলা পুলিশ, খবিরের পরিবার ও স্থানীয় লোকজন) 

নিহতের স্ত্রী আকলিমা বিবি বলেন, ‘‘বহরমপুরে কী কাজে যাবে তা বলেনি। হয়তো অসুস্থ বোধ করায় সেখানে চিকিৎসা করাতে গিয়েছিল। আর সেখানকার লোকজন পিটিয়ে মেরে ফেলল। লোকটাকে বাঁচাতে এল না কেউ!’’

খবিরের পকেট থেকে একটি মোবাইল, ২৪০০ টাকা উদ্ধার করে পুলিশ পরিবারের হাতে তুলে দিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, খবিরের মোবাইলের ‘কল ডিটেলস’ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া ভিডিয়ো ফুটেজ, শহরের বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গেও পুলিশ কথা বলবে।