গত বছর ভাল দাম মেলায় এ বার ঢেলে ফুলকপি চাষ করতে নেমেছিলেন বহু চাষি। বাদ সাধেনি আবহাওয়াও। আর তাতেই হয়েছে বিপদ! অতিফলনে কার্যত তলানিতে নেমেছে ফুলকপির দর। 

নদিয়া জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফুলকপি চাষ হয় মদনপুরে। তা ছাড়াও হরিণঘাটা, ধুবুলিয়া, কল্যাণী, নাকাশিপাড়া-সহ ১৮টি ব্লকেই কম-বেশি কপি ও শীতের আনাজের চাষ হয়। এখনও শীত তেমন জাঁকিয়ে পড়েনি। সাধারণত এই সময়ে কপির বাজারদর থাকে চড়া। গত বছরেও নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এক পিস ফুলকপি চাষিরা বিক্রি করেছিলেন প্রায় ১৫ টাকা করে। মধ্যস্বত্বভোগীর হাত ঘুরে ক্রেতারা তা কিনেছিলেন অন্তত ৩০ টাকায়। 

খেতের পর খেতে ফুলকপি আর সুন্দর ফুরফুরে আবহাওয়া সর্বনাশ ডেকেছে। বাজার-হাট উপচে যাচ্ছে কপিতে। হু-হু করে দর পড়েছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেকেই মাঠ থেকে কপি তুলতে ভয় পাচ্ছেন। জেলায় আনাজের কোনও হিমঘরও নেই, যেখানে ফুলকপি কিছু দিনের জন্য রেখে দাম চড়লে চাষিরা তা বার করে বাজারজাত করবেন। 

হরিণঘাটার সাতশিমুলিয়ার চাষি শ্যামল সর্দার বলছেন, ‘‘আমি এ বার ২৫ কাঠায় ফুলকপি লাগিয়েছিলাম। মাত্র ২০ হাজার টাকার কপি বিক্রি করতে পেরেছি। গত বছর ওই জমির ফুলকপি বিক্রি হয়েছিল ৬৫ হাজার টাকায়। চাষ করতেই তো খরচ হয়ে গিয়েছে প্রায় ২০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে আমি ও আমার বাড়ির লোকেরা যে শ্রম দিয়েছি, তা বাদই দিন। সে সব ধরলে ডাহা লোকসান হয়েছে।’’ শ্যামল জানান, চাষ করার আগে মহাজনের থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। আনাজ বেচে সুদের টাকা না ওঠায় তা নিজের পকেট থেকেই দিতে হবে। 

নাকাশিপাড়ার চাষি রহমত বিশ্বাস জানাচ্ছেন, অন্য বছর বড় ব্যবসায়ীরা সরাসরি জমিতে এসে ফুলকপি কিনে নিয়ে যেতেন। তাঁরা আনাজ তুলে নগদ টাকা দিতেন। এ বছর বাজার এত মন্দা যে কোনও ব্যবসায়ীর দেখাও মিলছে না। চাষিরা সরাসরি মাল নিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় বেথুয়াডহরি বাজারে। সরাসরি বিক্রি করেও কিন্তু গিয়েও দাম মিলছে না। 

গত কয়েক দিনে বেথুয়াডহরি বাজারে চাষিরা ২ টাকা দরে এক পিস ফুলকপি বিক্রি করেছেন। হরিণঘাটার পাইকারি ব্যবসায়ী সঞ্জিত সরকার জানাচ্ছেন, তিনি চাষিদের কাছ থেকে আড়াই টাকা দরে ফুলকপি কিনেছেন। ক্রেতাদের তা বিক্রি করবেন ৫ টাকা করে। তবে শহরের দিকে, যেমন কল্যাণী বা রানাঘাটে ১০ টাকা করেই ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে বাজারে। 

কল্যাণীর সপ্তপর্ণী বাজারের ব্যবসায়ী গোবিন্দ বিশ্বাস জানাচ্ছেন, কয়েক হাত ঘুরে সেখানে আনাজ আসে। তাই ক্রেতাদের বেশি দাম দিতে হচ্ছে। তবে গত বছরের তুলনায় এটা কোনও দামই নয়। গত বছর এই সময়ে তিনি এক পিস ফুলকপি বিক্রি করেছিলেন অন্তত ৪০ টাকায়। 

নদিয়া জেলার কৃষি দফতরের ভারপ্রাপ্ত উপ-অধিকর্তা (প্রশাসন) শান্তিরঞ্জন সরকারের মতে, ‘‘আসলে জেলায় বহুমুখী হিমঘর থাকলে চাষি এই সমস্যা থেকে অনেকটাই মুক্ত হতেতেন। কৃষি বিপণন দফতর আরও সক্রিয় হলেও কাজ হত।’’ রানাঘাটের নোকারিতে একটি হিমঘর তৈরি হয়েও পড়ে আছে। সেটি চালু থাকলে চাষিদের হয়তো এত বিপাকে পড়তে হত না বলেও দফতরের অনেক কর্মী মনে করছেন।