টিপ টিপ বৃষ্টি। ভেজা আঁধারেই রাস্তার ধারে হ্যাজাক-লণ্ঠন নিয়ে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ওঁরা। ইতিউতি ছুটে আসছে— ‘নদী এগিয়ে আসছে গো!’ আতঙ্কের গা। মায়াপুরের বড় রাস্তার ধারে বুধবার রাতভর দাঁড় করিয়ে রাখল কয়েকশো স্থানীয় বাসিন্দাকে। 
পাহাড়ায় ছিল পুলিশ, সেচ দফতরের জনা কয়েক কর্মীও। কিন্তু নদী ফুঁসতে ফুঁসতে রাস্তাতক এসে থমকে গেল। ভোরের দিকে তাঁরা ঘরে ফিরলেন বটে, তবে বুকচাপা আতঙ্ক নিয়ে। যে আতঙ্ক, বৃহস্পতিবার সারা দিন ছড়িয়ে থাকল শহরের আনাচ কানাচ জুড়ে।
বৃষ্টি থামায় আতঙ্কটা মুছে যাওরা কথা ছিল মুর্শিদাবাদের কান্দি ব্লকের প্রান্তিক গাঁ-গঞ্জে, মোছেনি। কারণ, পড়শি রাজ্য ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন জলাধার থেকে জল ছাড়ায় আকাশে রোদ্দুর নিয়েও ফুঁসে চলেছে ব্রাহ্মণী, কুঁয়ে, ময়ূরাক্ষী।
জলযন্ত্রণা ছড়িয়েছে গায়ে গা লাগানো বড়ঞা, ভরতপুর  ব্লকেও।  জলবন্দি হয়ে কেউ ঘরের চালায়, কেউ বা গাছের উপরে, সংখ্যাটা প্রায় প্রায় হাজার দেড়েক। 
চালার আড়ালে মাথা বাঁচানোর ছেঁড়াখোড়া পলিথিনের চাদর, ভড়ঞার বাসিন্দারা বলছেন, ‘‘কই গো প্রশান বলে কিছু আছে নাকি!’’ আসেনি ত্রাণ, অভিযোগ ছড়িয়েছে, তা নিয়েও নাকি রাজনীতি শুরু হয়েছে। ভরতপুর ব্লকের সুকদানপুর গ্রামের কয়েকটি জলবন্দি পরিবারকে উদ্ধার করেছে প্রশাসন। চাল-চিঁড়ের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানীয় জল মিলেছে। কিন্তু কি দোষ করেছেন কাশীপুর, বালিচুনা, কোল্লা ও চাঁদপুর গ্রামের বাসিন্দারা? তাঁদের অভিযোগ,  চার দিন ধরে জলবন্দি হয়ে থাকলেও প্রসাসন মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। কাশীপুরের বাসিন্দারা সমস্বরে বলছেন, ‘‘এখানেও রাজনীতি বুঝলেন না!’’ গড্ডা গ্রাম পঞ্চায়েতের উপ-প্রধান মহম্মদ কামরেজামান বলেন, “সুকধানপুরের বাসিন্দাদের জন্য ত্রানের সমস্ত কিছুই ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু কাশীপুর, বালিচুনা, চাঁদপুর ও কোল্লা গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে এখনও কোন কিছুই দিতে পারেনি। ওঁরা কী ব্রাত্য!’’
ভড়ঞা গ্রামের পঞ্চায়েত সদস্য বুদ্ধদেব সাহা বলেন, “টানা বৃষ্টিতে আমার এলাকায় প্রায় ৫০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ, কিন্তু ত্রিপল দেওয়া হচ্ছে মাত্র সাতটি। ওই ত্রিপল আমি কাকে দেব আর কাকে দেবনা!” ভরতপুর ২নম্বর ব্লকের তালিবপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় বড়খড়ি গ্রামের রাস্তায় প্রায় সাতশোমিটার এলাকা জুড়ে বাবলা নদীর জলে ঢুবে যাওয়ায় জলবন্দি। সেচদফতরের দাবি, বীরভূমের লাভপুর, কঙ্কালিতলা, লাঘাটা এলাকা নতুন করে ভেসেছে। সেই জলই লাঙলহাটা বিল উপচে  কুঁয়ে নদীতে মিশছে। জল তাই বেড়ে চলেছে হু হু করে।
নবদ্বীপ শহরের বিভিন্ন নিচু এলাকায়, যেমন প্রাচীনমায়াপুর, প্রতাপনগর, রানীরচড়ার বিভিন্ন এলাকায় জল জমেছে।  নবদ্বীপের পুরপ্রধান বিমানকৃষ্ণ সাহা বলেন, “টানা বৃষ্টিতে ইতিমধ্যে শহরের বিভিন্ন এলাকায় জল দাঁড়িয়ে গিয়েছে। বৃষ্টি দুর্গত মানুষকে ত্রিপল ও খাদ্য সামগ্রী বিলি করা শুরু হয়েছে। আমরা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি।”