প্রতিবাদ দেশ জুড়ে। নিন্দা আন্তর্জাতিক মহলেও।

একটি কনভেন্টে লুঠতরাজের পরে সত্তরোর্ধ্ব এক সন্ন্যাসিনীকে ধর্ষণের ঘটনায় দেশ তো বটেই, আন্তর্জাতিক আঙিনাতেও পৌঁছে গিয়েছে নদিয়া জেলার রানাঘাটের নাম। নির্যাতিতার সঙ্গে দেখা করতে রানাঘাটে চলে এসেছেন রোমান ক্যাথলিক চার্চের সদর দফতরের প্রতিনিধিও! এই অবস্থায় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে ক্যাথলিক চার্চের ওই প্রতিনিধির কাছে রাজ্যের তরফে দুঃখপ্রকাশ করলেন বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্র। সন্ন্যাসিনীর চিকিৎসা বা অন্য কোনও বিষয়ে প্রয়োজন মতো তাঁদের জানালে তাঁরা পূর্ণ সহযোগিতা করবেন বলেও ওই প্রতিনিধিকে আশ্বাস দিয়েছেন বিরোধী দলনেতা।

নির্যাতিতা সন্ন্যাসিনী এখন রানাঘাট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রবিবার নির্যাতিতার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন রোমান ক্যাথলিক চার্চের দুই প্রতিনিধি। বিকেল পৌনে তিনটে নাগাদ তাঁরা যখন হাসপাতালে পৌঁছন, তখন নির্যাতিতা ঘুমোচ্ছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিনিধি বলেন, “আমরা কতৃর্পক্ষের নির্দেশে এখানে এসেছি। ওই সন্ন্যাসিনীর সঙ্গে এর আগে আমাদের কখনও দেখা হয়নি। আমরা মানসিক ভাবে ওঁর পাশে দাঁড়ানোর জন্যই এসেছি। এটা একটা অস্বাভাবিক ঘটনা। আমার এই ৫৪ বছর বয়সে গোটা পৃথিবীতে এমন ঘটনা কখনও ঘটেছে বলে শুনিনি।” তবে এই হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবায় তাঁরা খুশি বলেও জানিয়েছেন ওই সন্ন্যাসিনী।

হাসপাতালের সুপারের সঙ্গে এ দিনই বিকেলে কথা বলতে গিয়েছিলেন বিরোধী দলনেতা। তখন নির্যাতিতার শয্যার পাশেই ছিলেন রোমান ক্যাথলিক চার্চের ওই প্রতিনিধিরা। তাঁদের এক জন (যিনি রোম থেকে এসেছেন) ভারতীয় ওই সন্ন্যাসিনী ‘কনভেন্ট অফ জেসাস অ্যান্ড মেরি’ (সিজেএম)-এর সদর দফতরের তরফে এ দেশের বিষয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত। খবর পেয়ে তিনি পরে হাসপাতাল সুপারের ঘরে এলে সূর্যবাবুর সঙ্গে তাঁর কথা হয়। সূর্যবাবু পরে বলেন, “অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ঘটনা। আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেটা বিবেচনার বিষয় ছিল না। রোমান ক্যাথলিক চার্চের ওই সন্ন্যাসিনীকে বলেছি, আমরা এখানে বিরোধী পক্ষে আছি। কিন্তু যে ঘটনা ঘটেছে, তার জন্য রাজ্যের তরফে আমি দুঃখপ্রকাশ করছি। চিকিৎসা বা অন্য কোনও ব্যাপারে প্রয়োজন হলেই সাহায্য করতে যে তৈরি, তা-ও বলেছি।”

সিজেএম-এর ভারতীয় বিষয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সন্ন্যাসিনীর সঙ্গে পরে ফোনে যোগাযোগ করেন তৃণমূলের রাজ্যসভার নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েনও। ওই সন্ন্যাসিনীর কথা শুনে ডেরেক অভিভূত। ডেরেকের কথায়, “এমন ঘটনার পরেও উনি বললেন, আমরা অপরাধীদের জন্য প্রার্থনা করছি। তারা জানে না, কী করেছে!” ঘটনার প্রতিবাদে আর্চবিশপের নেতৃত্বে আজ, সোমবার পার্ক স্ট্রিটে যে মিছিল হবে, তাকেও সমর্থন জানিয়েছেন ডেরেক।

কংগ্রেস নেতা পি সি চাকো এ দিন ঘটনার নিন্দা করে দোষীদের ‘চরম শাস্তি’ দাবি করেছেন। তবে, তাঁর অভিযোগ, “ঘটনার গুরুত্ব যতটা, সেই অনুযায়ী সক্রিয়তা দেখাচ্ছে না কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার। সেটাই সব চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক।” মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য ঘটনার সিআইডি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও এখনও পর্যন্ত কাউকে ধরা যায়নি।

সন্ন্যাসিনীকে ধর্ষণের ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস)-ও। একই সঙ্গে তাদের বক্তব্য, এমন ঘটনায় ধর্মীয় রং লাগিয়ে সমাজে বিভাজনের চেষ্টা ঠিক নয়। ঘটনার পরে পশ্চিমবঙ্গে শাসক দলের শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আক্রোশের যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তৃণমূলের নাম না করে আরএসএসের শীর্ষ নেতৃত্ব এ দিন তার জবাবও দিয়েছেন। এ দিন নাগপুরে সঙ্ঘের ‘অখিল ভারতীয় প্রতিনিধি সভা’-র বৈঠকের শেষে আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক সুরেশ ভাইয়াজি জোশী বলেন, “ধর্ষণ আমাদের ঐতিহ্যের বিরোধী। সভ্য জগৎ এর প্রতিবাদ করবেই। কিন্তু, ধর্মের মোড়ক লাগিয়ে এমন ঘটনাকে ব্যবহার করে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলির মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করা ঠিক নয়।”