গম পোড়া জমি থেকে রান্নাঘরের উনুন— ফাগুন পড়ার আগেই আগুন ছড়িয়েছে গাঁ গঞ্জে।

নিত্য বছরে এটাই সময়, হুহু হাওয়া, শুষ্ক আবহাওয়া আর সীমাহীন অসাবধানতা, তিনের ধাক্কায় সে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে মাঠ থেকে গ্রামের চালায়, ঘর থেরে পড়শির ঘরে। কিন্তু নেভাবে কে? 

এ প্রশ্নটায় এসে থমকে যাচ্ছে স্থানীয় পঞ্চায়েত, পরিচিত প্রশাসন। দমকল কোথায়? 

পুলিশের বালতি, প্রতিবেশীর বালির বস্তা, গ্রামবাসীদের হুটোপুটি হইচই না থাকলে প্রাক ফাগুনের আগুনে গ্রামের পর গ্রাম যে পুড়ে খাক হয়ে যেত, এ কথা মানছেন প্রাক্তন এক জেলা কর্তাই। বলছেন, ‘‘সারা মুর্শিদাবাদে সাকুল্যে খান পাঁচেক দমকলকেন্দ্র। তারা কোথায় ছুটবে আর কোথায় নয়! অনেক গ্রামে তাদের পৌঁছনোর আগেই ভস্মীভুত বাড়ি থেকে ছাই সরানোর কাজ শুরু হয়ে যায়।’’

ডোমকল মহকুমায় সে আঁচ ইতিমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে। গত কয়েক দিনে গাঁ গঞ্জে আগুন লাগার ঘটনা অন্তত সাতটি। এবং কোনও ক্ষেত্রেই দমকল ত্রাতার ভূমিকা নিতে পারেনি। কারণটা খুব স্পষ্ট, ডোমকলে কোনও দমকলকেন্দ্র নেই।

ডোমকল, ব্লক থেকে মহকুমা শহরে উন্নীত হয়েছে প্রায় ২০ বছর আগে। পুরসভার বয়সও ৪ বছর হতে চলেছে। জনসংখ্যা থেকে দোকানপাট ও অফিস আদালতও বেড়েছে হুহু করে। কিন্তু এখনও দমকলকেন্দ্র চালু হয়নি ডোমকলে। নতুন নীল সাদা বাড়ি তৈরি হয়ে পড়ে রয়েছে। প্রশাসনের কর্তারা বলছেন, ‘‘পরিকাঠামো তৈরি। সব ঠিক থাকলে কয়েকটা মাসের অপেক্ষা। ডোমকলের দমকলকেন্দ্র চালু হল বলে।’’ কিন্তু তার আগেই এই আগুনে হাওয়ায় উত্তাপ যে ছড়িয়ে পড়ছে!

ডোমকলের বাসিন্দাদের দাবি, ডোমকলের ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনও দমকলকেন্দ্র নেই। ফলে সব ক্ষেত্রেই আগুন লাগার পরে দমকলের অপেক্ষা কার্যত পুড়ে মরার শামিল বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা!

আগুনে পুড়ে সব হারানো মানুষের সংখ্যাও সে ব্লকে কম নয়। তাঁদেরই এক জন শেখ মোক্তার বলছেন, ‘‘দু’বছর আগে, গ্রামে আগুন লেগেছিল। দমকলে খবর গেল। বহরমপুর থেকে যখন ইঞ্জিন এল ততক্ষণে গ্রামের তেরোটা ঘর পুড়ে শেষ!’’ এমনই এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বছর চারেক আগে, জলঙ্গির হুকাহারা গ্রামের বড় একটা অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল দমকল আসার আগেই। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ঠিক আগে, ওই ঘটনায় পুড়ে ছাই হয়েছিল বই খাতা, পোশাক। যা পড়ে মানুষ ঘর ছেড়েছিল, আগুনের হাত থেকে বাঁচতে সেটা ছাড়া আর কিছুই মেলেনি তার। করিমপুর কিংবা বহরমপুর থেকে দমকলের ইঞ্জিন আসার আগেই সব ছাই হয়ে গিয়েছিল।

স্থানীয় এলাকার বাসিন্দা ইজলুল সরকার বলেন, ‘‘সেই সময়ে কাছাকাছি দমকল কেন্দ্র থাকলে অনেটাই রক্ষা হত আমাদের গ্রামের। দাড়িয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না সাধারণ মানুষের। এমন একটি পরিষেবা থেকে আমরা এত দিন কেন বঞ্চিত সেটাই বুঝতে পারি না।’’

একই ভাবে তিন বছর আগে ডোমকলের কাশিপুর এলাকাতেও গোটা গ্রাম শেষ হয়ে গিয়েছিল আগুনের লেলিহান শিখায়। গমের জমি থেকে ছড়ানো সেই আগুন ফাল্গুনের উত্তরে হাওয়ায় গোটা পাড়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল মিনিট কয়েকে। 

ডোমকলের বিডিও পার্থ মণ্ডল বলছেন, ‘‘আমাদের বিপযর্য় মোকাবেলা দল সব সময় প্রস্তত থাকে। তা ছাড়া মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে আমরা প্রচারও শুরু করব দিন কয়েকের মধ্যে।’’